হোয়াটসঅ্যাপে চাঁদা আর মৃত্যুর পরোয়ানা: পুত-নাতির লাশ নিয়ে কূল পাবে না

চাঁদাবাজির ভয়াল ফাঁদে সাধারণ পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:১৪

চট্টগ্রামে ফের ফণা তুলেছে চাঁদাবাজির ভয়াল থাবা। পাঁচলাইশ থেকে বায়েজিদ, হামজারবাগ থেকে মোজাফফরনগর-পুরো নগরী যেন এখন এক অদৃশ্য আতঙ্কের আতুড়ঘর।

পুলিশের খাতায় পলাতক থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’এর নাম ভাঙিয়ে একের পর এক ব্যবসায়ী ও গৃহস্থের মুঠোফোনে আসছে মৃত্যুপরোয়ানা।

প্রযুক্তির আশ্রয়ে সীমানা পার হয়ে আসা একটি মাত্র হোয়াটসঅ্যাপ কল কিংবা এক লাইনের অডিও বার্তা স্তব্ধ করে দিচ্ছে আস্ত পরিবারের স্বস্তি।

২০ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে সন্তান ও স্বজনদের বুলেটে ঝাঁঝরা করার সুনির্দিষ্ট হুমকি এখন কোনো কাল্পনিক চিত্র নয়, চট্টগ্রামের বাস্তব প্রতিদিনের উৎকণ্ঠা।

গত ৩১ আগস্ট নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার মোজাফফরনগরে ঘটে যায় এমনই এক ভয়াবহ ঘটনা।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মাকসুদ চৌধুরীর মুঠোফোনে ভেসে ওঠে একটি বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর। নিজেকে বড় সাজ্জাদের বিশ্বস্ত সহযোগী রায়হান পরিচয় দিয়ে অপর প্রান্ত থেকে চাঁদা দাবি করা হয় ২০ লাখ টাকা।

শুধু টাকায় ক্ষান্ত হয়নি সেই কণ্ঠ, উচ্চারণ করেছে হাড়হিম করা বাক্য-মোজাফফরনগরে তোমার সঙ্গে আমার লোক থাকবে। কোথায় যাচ্ছ, কী করছ, সব দেখবে আমাদের লোকজন..।

‘২০ লাখ টাকা না নিলে পুত-নাতির লাশ নিয়ে কূল পাবে না, দৌড়াদৌড়ি করেও। মেয়ে যেটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে…হবে অনে।’

ঘটনার আকস্মিকতায় দিশেহারা পরিবারটি গতকাল বৃহস্পতিবার বায়েজিদ বোস্তামী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করেন মাকসুদ চৌধুরীর স্ত্রী মাহফুজা রুনা।

কিন্তু কাগজের এক টুকরো জিডি কি কাটাতে পেরেছে সেই রক্ত হিম করা ভয়? ব্যবসায়ী মাকসুদ চৌধুরীর চোখে-মুখে এখন শুধু স্বজন হারানোর আতঙ্ক।

বায়েজিদ বোস্তামী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তফা কামাল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, হুমকিদাতাদের শনাক্ত করতে পুলিশের কাজ চলছে।

বিস্ময়করভাবে, বিদেশে পলাতক মূল সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ অবশ্য এই ঘটনার পর সম্পূর্ণ দায় অস্বীকার করেছেন। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁর দাবি, ‘আমার কোনো লোক চাঁদা চেয়ে ফোন করেনি। নিরীহ কোনো মানুষের ক্ষতি আমরা করি না। আমাদের নাম ব্যবহার করে কোনো টোকাই হয়তো এই কাজ করেছে।’

তবে প্রশ্ন ওঠে, সাজ্জাদ দায় এড়ালেও তাঁর নামে গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্ক কতটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে যে, রাস্তার ‘টোকাই’ থেকে শুরু করে সক্রিয় অপরাধীরাও স্বাচ্ছন্দে মানুষের প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস পাচ্ছে? সূত্র-প্রথম আলো

মাকসুদ চৌধুরীর ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়। সাম্প্রতিক সময়ে নগরীতে চাঁদাবাজির এই সিন্ডিকেট ক্রমেই রক্তপিপাসু হয়ে উঠছে।

এর আগে গত ১১ আগস্ট হামজারবাগ রুনা টাওয়ারের মালিক মোহাম্মদ ইউসুফের পরিবারের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। দুপুর ১২টায় হোয়াটসঅ্যাপে এক ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়ার পর রাতে সরাসরি ভবনের ফটকে গুলিবর্ষণ করে সন্ত্রাসীরা।

গত ১৩ জুলাই বড় দিঘিরপাড় দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ভবনে ২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে হামলা ও তাণ্ডব চালায় সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমনের বাহিনী। পরবর্তীতে মামলা ঠুকে দেওয়ার পর উল্টো চাঁদার দাবি বাড়িয়ে করা হয় ৫০ লাখ টাকা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সুযোগ নিয়ে চট্টগ্রামে খুন ও চাঁদাবাজিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে একাধিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।

ছোট সাজ্জাদ, মোবারক হোসেন ইমন কিংবা গলাকাটা মোবারক গ্রেপ্তার হলেও মো. রায়হান, বোরহান উদ্দিন ও কাদেরের মতো দুর্ধর্ষ সহযোগীরা এখনো পুলিশের নাগালের বাইরে।

যেখানে রায়হানের মতো পলাতক আসামিরা নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, সেখানে তাদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আপাত ধীরগতি সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তাকে চরম প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

চট্টগ্রাম এখন আর শুধু বাণিজ্যিক রাজধানী নয়-এটি যেন এক অদৃশ্য নজরদারির বন্দিশালা, যেখানে প্রতিটি কল রিসিভ করার আগে ব্যবসায়ীদের হৃদকম্প শুরু হয়।

মোজাফফরনগরের মাকসুদ চৌধুরী কিংবা হামজারবাগের ইউসুফদের মতো সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল তদন্তের আশ্বাস নয়, প্রয়োজন অপরাধীদের শেকড় উপড়ে ফেলার কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি