দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম বন্দর প্রবেশ করতে চলেছে এক অভূতপূর্ব যুগে। শতভাগ বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে কর্ণফুলী নদীর লালদিয়ার চরে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত ‘লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল’এর নির্মাণকাজ।
রোববার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে দেশের প্রথম ‘গ্রিনফিল্ড’ টার্মিনাল নির্মাণের এই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ উদযাপিত হয়।
বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির নতুন অধ্যায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এই প্রকল্পকে দেশের বাণিজ্য খাতের এক নতুন সূচনা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তিনি জানান, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় নির্মিত এই টার্মিনাল প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ টিইইউএস (TEUs) কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে সক্ষম হবে।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই প্রকল্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনার প্রতি আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
অন্যদিকে, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য চট্টগ্রামকে পুরো অঞ্চলের লজিস্টিক্যাল হাবে পরিণত করা। ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য আমাদের রয়েছে, তা অর্জনে বেসরকারি খাত ও বৈদেশিক বিনিয়োগকে সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়া হবে।
প্রকল্পের মেয়াদ ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব কর্ণফুলীর মূল মোহনার কাছে ৩২ একরের প্রধান টার্মিনালসহ মোট ৪৯.১৫ একর জমিতে গড়ে উঠছে এই মেগা প্রকল্প।
আন্তর্জাতিক বন্দর ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ ডেনমার্কের মেয়ার্স্ক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ‘এপিএম টার্মিনালস’ প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে এটি নির্মাণ ও পরিচালনা করবে।
চুক্তির ধরণ: ৩ বছরের রূপান্তর ও নির্মাণ কাজ শেষে সংস্থাটি আগামী ৩০ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা করবে (শর্ত সাপেক্ষে যা আরও ১৫ বছর বর্ধিত হতে পারে)।
কৌশলগত সুবিধা: নদীর কোনো ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক না পেরিয়েই সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের এবং ৬ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার বিশাল জাহাজগুলো সরাসরি এই জেটিতে ভিড়তে পারবে।
পরিবেশবান্ধব ও স্বয়ংক্রিয়: এটি হতে চলেছে দেশের প্রথম পরিবেশবান্ধব (Greenfield) ও ২৪/৭ নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদানকারী আধুনিক টার্মিনাল।
ইতিবাচক আশাবাদ বনাম দীর্ঘমেয়াদী উদ্বেগ ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার এবং এপিএম টার্মিনালসের সিইও রমেশ ডেভিড প্রকল্পটিকে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
দেশের সাধারণ ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারীরাও দ্রুত ও সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য খালাসের সুবিধাকে স্বাগত জানিয়েছেন।
তবে মুদ্রার অপর পিঠে রয়েছে ভিন্ন মতামত।
বন্দর রক্ষা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্তরা মনে করছেন, একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি সংস্থার হাতে তুলে দিলে ভবিষ্যতে বন্দরের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ শিথিল হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার জন্য চ্যালেঞ্জিং।
সব বিতর্ক ও প্রত্যাশার দোলাচালে, লালদিয়ার চরের এই আধুনিক অবকাঠামো আগামী তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশের সমুদ্রবাণিজ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে-এমনটাই প্রত্যাশা করছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

