ঝকঝকে কাচের দেয়াল, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিচ্ছন্ন পরিবেশ আর তাকভরা পণ্যের পশরা-চট্টগ্রাম নগরীর ‘উৎসব সুপার মার্কেট’ বা ‘উৎসব সুপার শপ’-এ ঢুকলেই চোখে পড়ে এক আধুনিক রূপ।
তবে এই চটকদার আলোর আড়ালে গড়ে তোলা হয়েছে চরম অনিয়ম, ভোক্তা প্রতারণা, ভয়ংকর বাণিজ্যিক জালিয়াতি ও নিরাপত্তাহীনতার এক নীরব সাম্রাজ্য।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং ভুক্তভোগীদের পৃথক তথ্যে উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির বহুমুখী অপরাধের বিবরণ।
নারী হয়রানি থেকে বিনিয়োগকারীকে খুনের হুমকি-আড়ালে ক্ষমতার জোর:
উৎসব সুপার শপের আলোকোজ্জ্বল কাচের দেয়ালের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে ভয়ভীতি আর মারাত্মক শোষণের গল্প। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুচ সালামের ভাগিনা ও আত্মীয় পরিচয়ের প্রভাব খাটিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
খুলশীর মতো আবাসিক এলাকায় নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ করে উৎসব সুপার মার্কেট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন ব্যবসায়ী ছাদেক আলী।
চুক্তির ভিত্তিতে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন এবং প্রতিষ্ঠানের অপারেশনাল দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
শর্ত অনুযায়ী ন্যূনতম ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার কথা থাকলেও ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে চালুর পর তাকে কোনো চুক্তিপত্র বা হিসাব দেওয়া হয়নি।
পরবর্তীতে লভ্যাংশের টাকা কমিয়ে দেওয়া এবং মূলধন ফেরত চাওয়ায় ছাদেক আলীকে রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে প্রাণনাশের ও বড় ধরনের ক্ষতির হুমকি দেওয়া হয়।
এমনকি অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার মো. জহিরের মাধ্যমে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত একটি কাল্পনিক হিসাব দেখিয়ে বিনিয়োগকৃত মূলধনের চেয়ে কম টাকা প্রাপ্য হিসেবে উপস্থাপন করার অভিযোগ উঠে এসেছে।
প্রভাবের এই ছায়া শুধু বিনিয়োগকারীর ওপরই পড়েনি, পড়েছে সাধারণ কর্মীদের ওপরও।
প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মী মোহাম্মদ রাসেলের অভিযোগ অনুযায়ী, ইনচার্জ আলমগীর জয় নারী কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত করার ভয় দেখিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন প্রস্তাব ও চাপ সৃষ্টি করে আসছিলেন। চাকরি হারানোর আতঙ্কে ভুক্তভোগী নারী কর্মীরা মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
তিনি সিভিশন নামে একটা ফেসবুক পেইজে করা পোস্টে কমেন্টে বক্সে আৎকে উঠার মত এসব তথ্য দিয়ে কমেন্ট করেছেন। বৃহস্পতিবার ৩টা ৪০ মিনিটে পোস্টের কমেন্টে তিনি লেখেন, উৎসব সুপার শপের ম্যানেজমেন্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমি আগে উৎসব সুপার শপে চাকরি করতাম। সেখানে আলমগীর জয় নামে একজন ইনচার্জের আচরণ নিয়ে আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।
চারদিনের ব্যবধানে ১৮ লাখ টাকা জরিমানা ও কারাদণ্ড
উৎসব সুপার মার্কেটের আইন অমান্য ও অনিয়মের মাত্রা এতটাই বেপরোয়া রূপ নিয়েছে যে, তদারকি সংস্থাগুলোর অভিযানে চারদিনের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটিকে মোট ১৮ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দিয়েছেন পৃথক আদালত।
খাদ্য জালিয়াতি ও বিষাক্ত পণ্য বিক্রি:
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরিচালিত এই অভিযানে সবচেয়ে চোখ কপালে ওঠার মতো তথ্য মিলেছে ‘উৎসব সুপার শপ’-এ। ঝকঝকে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের আড়ালে গ্রাহকদের হাতে দিনের পর দিন তুলে দেওয়া হচ্ছিল পচা মরিচ, নষ্ট মসলা, মেয়াদোত্তীর্ণ মোমোস এবং মেয়াদহীন চকলেট।
উৎসবের জালিয়াতি শুধু পচা খাদ্য বিক্রিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, আড়ালে চলেছে ভোক্তা ঠকানোর সুনির্দিষ্ট ছক। আমদানিকৃত পণ্যের মূল পুষ্টিতথ্য ঢেকে দিয়ে নিজস্ব স্টিকার বসানো, নিবন্ধনের তথ্য গায়েব করা, নিবন্ধনবিহীন শিশুখাদ্য ও অনুমতিহীন ফুড সেপ্লিমেন্ট বিক্রির মাধ্যমে তারা জনস্বাস্থ্যকে ঠেলে দিয়েছে চরম ঝুঁকিতে।
এমনকি একই অননুমোদিত সরঞ্জামে গরু ও খাসির মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং অনুমতি ছাড়া ঘরোয়া আচার ও পণ্য বিক্রির জঘন্য সত্যও বেরিয়ে এসেছে এই একটি শোরুম থেকেই।
শপে মানহীন আচার ও হোমমেইড পণ্য বিক্রি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মাংস সংরক্ষণ, মেয়াদোত্তীর্ণ মোমোস সংরক্ষণ ও বিক্রি, আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যে যথাযথ লেবেলিং না থাকা এবং পুষ্টিতথ্য গোপন করার মতো অনিয়ম পাওয়া যায়।
এছাড়া আমদানিকারকের যথাযথ তথ্য ছাড়া খাদ্যপণ্য বিক্রি, জিলাপিতে ব্যবহৃত রঙের তথ্য না থাকা, একই সরঞ্জামে বিভিন্ন ধরনের মাংস প্রক্রিয়াকরণ, কোল্ড স্টোরেজ যথাযথভাবে পরিচালনা না করা, নষ্ট খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ ও বিক্রি এবং প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও অনুমোদন ছাড়া শিশুখাদ্য, ফুড সাপ্লিমেন্ট ও হোমমেইড পণ্য বিক্রির প্রমাণ পাওয়া যায়।
অনিয়মের এই মহোৎসবে উৎসব সুপার শপকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। শনিবার (২২ আগস্ট) বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের ১ম শ্রেণির মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তফার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে এ জরিমানা অনাদায়ে সংশ্লিষ্টদের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
পাশাপাশি আমদানিকৃত ফলমূলের ক্রয়মূল্য ও সংশ্লিষ্ট তথ্য আদালতে উপস্থাপনের নির্দেশ এবং যথাযথ অনুমোদন ও পুষ্টিতথ্য ছাড়া আচার ও হোমমেইড পণ্য বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নকশা ব্যত্যয় ও অবৈধ পার্কিং: হালিশহর এক্সেস রোডের আউটলেটে সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেনের উপস্থিতিতে এবং স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট হামীমুন তানজীনের পরিচালনায় চালানো অভিযানে নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ ও নিজস্ব পার্কিং না থাকার প্রমাণ মেলে।
গ্রাহকদের গাড়ি রাস্তার জায়গায় পার্কিং করার অপরাধে সিডিএর ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিষ্ঠানটিকে ৮ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে দুই বছরের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন। আগামী ২৭ নভেম্বরের মধ্যে নকশার ব্যত্যয়কৃত অংশ সংশোধনের জন্য মুচলেকা নিয়েছে সিডিএ।
সিডিএর অথরাইজড অফিসার-২ তানজিব হোসেন জানান, অভিযানকালে উৎসব সুপার মার্কেট কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে অনুমোদিত নকশা দেখাতে পারেনি। পরিদর্শনে দেখা যায়, বাণিজ্যিক ভবন হলেও নকশা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পার্কিং সুবিধা সেখানে নেই। কর্তৃপক্ষ রাস্তার জায়গায় গাড়ি পার্কিং করার কথা জানিয়েছে।
এসব অনিয়মের কারণে সিডিএর ম্যাজিস্ট্রেট ৮ লাখ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে দুই বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
ভোক্তার পেটে মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার তুলে দেওয়া থেকে শুরু করে অবৈধ ভবন নির্মাণ, বিনিয়োগকারীর অর্থ আত্মসাৎ এবং কর্মস্থলে নারী হয়রানি-সব মিলিয়ে উৎসব সুপার মার্কেট আজ এক ভয়ংকর অপরাধের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা রক্ষায় তদারকি সংস্থাগুলোর কঠোর এবং সমন্বিত আইনি পদক্ষেপ এখন সময়ের মূল দাবি।
সকল অভিযোগের বিষয়ে উৎসব সুপার শপের কর্তৃপক্ষের সাথে একাধিকবার যোগোযোগের চেষ্টা করা হলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তাদের ওয়েভসাইটে দেওয়া 018*445***2 এবং 018*9**0**1 নাম্বার দুটির হোয়াটসঅ্যাপে কিছু প্রশ্ন রেখে বার্তা পাঠালেও সেখান থেকে কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

