লালদিয়াচর টার্মিনাল: নিখুঁত চুক্তির অন্তরালে কী? সংসদে নৌমন্ত্রীর অনমনীয় ঘোষণা!

প্রকাশিত: ১৩ জুলাই, ২০২৬ ২১:৩৩

চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়াচর কন্টেইনার টার্মিনাল। কর্ণফুলী নদীর ডান তীরের এই ভূখণ্ডটি নিয়ে দেশের অর্থনীতি আর ভূরাজনীতিতে আলোচনা কম হয়নি।

অবশেষে সেই লালদিয়াচরের ভবিষ্যৎ সমীকরণ স্পষ্ট করলেন নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তবে তার এই স্পষ্টীকরণের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক চরম অনমনীয় বার্তা।

সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ডেনমার্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে করা বহুল আলোচিত কনসেশন চুক্তি বাতিল বা পুনঃ মূল্যায়নের কোনো দূরবর্তী পরিকল্পনাও সরকারের টেবিলে নেই।

সোমবার (১৩ জুলাই) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রীর এই অনড় অবস্থান দেশের সচেতন মহলকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।

প্রশ্ন উঠছে, যে চুক্তি নিয়ে বিভিন্ন মহলে ফিসফাস, সেখানে কোনো প্রকার সংশোধনের পথ কেন আগেভাগেই বন্ধ ঘোষণা করা হলো?

নৌমন্ত্রী সংসদে দাবি করেছেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) আইন ও সংশ্লিষ্ট সব নীতিমালা ‘নিখুঁতভাবে’ অনুসরণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক সরকারের সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) কাঠামোর আওতায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সূত্রপাত ২০২১ সালের ৩০ জুন, একটি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকের (MoU) মাধ্যমে।

এর প্রায় দুই বছর পর, ২০২৩ সালের ২১ মে ডেনমার্কভিত্তিক মার্স্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস লালদিয়াচরে টার্মিনাল নির্মাণের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়।

সেই বছরেরই ২৯ নভেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়ক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রজেক্টটিকে নীতিগত অনুমোদন দেয়। ২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি দুই দেশের প্রথম পিপিপি জয়েন্ট প্ল্যাটফর্‌ম সভায় ডেনমার্ক সরকার এপিএম টার্মিনালসকে চূড়ান্ত মনোনীত করে।

এরপর ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ট্রানজ্যাকশন অ্যাডভাইজার হিসেবে আইনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করলে, ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও এপিএমটি বিভি-এর মধ্যে সেই বহুল প্রতীক্ষিত ‘ঐতিহাসিক’ কনসেশন চুক্তি সই হয়।

৩৩ বছরের সমীকরণ: কেন এই অনড় অবস্থান?

নৌমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, এই চুক্তির মোট মেয়াদ ৩৩ বছর। এর মধ্যে প্রথম ৩ বছর নির্মাণকাল এবং পরবর্তী ৩০ বছর পরিচালনাকাল।

তবে আসল চমক লুকিয়ে আছে অন্য শর্তে-চুক্তির শর্তানুযায়ী পরবর্তীতে আরও ১৫ বছর এই মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ, প্রায় অর্ধশতক ধরে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ চলে যাচ্ছে একটি বিদেশি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে।

চট্টগ্রাম বন্দরের খালি জায়গায় নির্মিতব্য এই অত্যাধুনিক টার্মিনালে ডেনিশ প্রতিষ্ঠানটি ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (যা দেশীয় মুদ্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগ করবে।

মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, এই বিপুল আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ফলে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে, দেশের অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বৈচ্ছিক উন্নত প্রযুক্তি স্থানান্তরের এক বিশাল সুযোগ তৈরি হবে।

মন্ত্রীর এই আশাবাদের বাণী যতই আকর্ষণীয় শোনাক না কেন, সচেতন বিশ্লেষকদের মনে কিছু মৌলিক প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়।

প্রথমত, কোনো চুক্তির শর্ত বা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কি এতটাই ধোয়া তুলসী পাতা হতে পারে যে, শুরুতেই ‘বাতিল বা পুনঃ চুক্তির কোনো পরিকল্পনা নেই’ বলে সাফ জানিয়ে দিতে হবে? এই অতি-নিশ্চয়তা কি কোনো কিছুর সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে?

দ্বিতীয়ত, আইএফসি-র মাধ্যমে যে ডিউ ডিলিজেন্স বা আইনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে, তার খুঁটিনাটি কি জনসাধারণের কিংবা জাতীয় স্বার্থের সম্পূর্ণ অনুকূলে?

তৃতীয়ত, ৩৩ বছরের সঙ্গে আরও ১৫ বছর যুক্ত করার যে বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে, তার বিনিময়ে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত কোনো ঝুঁকিতে পড়বে কি না, তা কি স্বাধীন কোনো জাতীয় কমিটি দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়েছে?

বিনিয়োগের আড়ালে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদের (Strategic Asset) নিয়ন্ত্রণ যখন কোনো বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির হাতে প্রায় ৫০ বছরের জন্য সঁপে দেওয়া হয়, তখন তা কেবল অর্থনৈতিক চুক্তি থাকে না; তা হয়ে দাঁড়ায় গভীর জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়।

নৌমন্ত্রী সংসদে এই চুক্তিকে ‘স্বচ্ছ ও নিখুঁত’ বলে সার্টিফিকেট দিলেও, এই অতি-আত্মবিশ্বাস ও অনড় অবস্থানই মূলত রহস্যের জন্ম দিচ্ছে।

দেশের অর্থনীতিবিদ ও বন্দর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশাল চুক্তির ভেতরের প্রতিটি ধারা, রাজস্ব ভাগাভাগির অনুপাত এবং ভবিষ্যৎ সার্বভৌমত্বের সুরক্ষার বিষয়গুলো স্বাধীন ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে পুনঃ পরীক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।

অন্যথায়, ‘উন্নত প্রযুক্তির’ মোড়কে দেশ দীর্ঘমেয়াদি কোনো ফাঁদে পা দিচ্ছে কি না-তা সময়ই বলে দেবে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি