আদালতে অর্থজারি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে ৯ জুলাই। কিন্তু সেই পরোয়ানার অনলাইন কপি সংশ্লিষ্ট থানায় পৌঁছেছে প্রায় দেড় মাস পর-২৩ আগস্ট। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পর সাধারণত যেকোনো আসামির স্থান হওয়ার কথা পুলিশি হেফাজতে।
তবে প্রভাব ও পদের জোর থাকলে আইন যে অনেক সময় থমকে থাকে, তার আরও একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হলো চট্টগ্রাম রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্ব) চট্টগ্রাম কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. মমিনুল ইসলাম মামুনকে প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা গেছে বলে জানা গেছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে-আদালতের পরোয়ানা জারির পরও তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া কতটা এগিয়েছে?
অর্থজারি মোকদ্দমা নম্বর ৩/২৪-এর আওতায় বগুড়া সিনিয়র সিভিল জজ আদালত (সদর) থেকে গত ৯ জুলাই বাংলাদেশ রেলওয়ে (পূর্ব) সিআরবির চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার কার্যালয়ে কর্মরত এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. মমিনুল ইসলাম মামুনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
আদালতের ওই নির্দেশের পরও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট চট্টগ্রাম থানায় পরোয়ানার কপি পৌঁছায়নি। অবশেষে গত ২৩ আগস্ট এই পরোয়ানার অনলাইন কপি চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি থানায় এসে পৌঁছায়।
এতে স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে আরও একটি প্রশ্ন-৯ জুলাই পরোয়ানা জারির পর ২৩ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় দেড় মাসের ব্যবধান কেন? আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় এই বিলম্বের কারণ কী, সেটিও এখন আলোচনায়।
মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি মমিনুল ইসলাম মামুনের পিতার নাম নুরুল ইসলাম। বগুড়া সদরের এই টাকা ডিগ্রি জারী মামলায় আদালত তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেও প্রশাসনিক কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবে তিনি গ্রেফতার এড়িয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, পরোয়ানা জারির এক মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও বহাল তবিয়তে নিজের দাপ্তরিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন এই কর্মকর্তা। এমনকি সম্প্রতি রেল সচিবসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সভায় ও কর্মসূচিতে তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা গেছে।
তবে আদালতের নির্দেশের বিষয়টি এখন সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে।
কোতোয়ালি থানার ওয়ারেন্ট অফিসার এএসআই সোহেল বলেছেন, গত ২৩ আগস্ট ওয়ারেন্টের কপি অনলাইনে তাঁরা পেয়েছেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (দুপুর ১ টা ২০ মিনিট) পর্যন্ত মূল কপি থানায় পৌছেনি জানান এএসআই সোহেল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আজ-কালকের মধ্যে মূল কপি তাঁদের হাতে এসে পৌঁছাবে। এরপর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
থানা কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্যের পর এখন মূল নজর আইনগত পদক্ষেপের দিকে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী প্রক্রিয়া কীভাবে এবং কত দ্রুত এগোয়, সেটিই দেখার বিষয়।
তবে বিষয়টি শুধু একটি অর্থজারি মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। কারণ অভিযুক্ত ব্যক্তি বাংলাদেশ রেলওয়ের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা।
একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্বেও রয়েছেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানার খবর প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক-দুই দিক থেকেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
আরও তাৎপর্যের বিষয় হলো, গত ৯ জুলাই তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলেও সম্প্রতি তাঁকে রেল সচিবসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা গেছে বলে জানা গেছে।
এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে-আদালতের পরোয়ানা জারির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সব মহল জানত কি না, জানলে তাঁর বিরুদ্ধে এতদিন কী ধরনের প্রশাসনিক বা আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন এবং একজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জারি হওয়া পরোয়ানা কার্যকর করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এখন দেখার বিষয়, বগুড়া সিনিয়র সিভিল জজ আদালতের জারি করা অর্থজারি মোকদ্দমা নং-৩/২৪ (টাকা ডিগ্রি জারী), বগুড়া সদর-এর পরোয়ানার মূল কপি হাতে পাওয়ার পর কোতোয়ালি থানা কী ধরনের আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়।
একদিকে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা, অন্যদিকে রেলের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ-এই তিনটি বিষয়কে ঘিরেই এখন তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
এদিকে এ বিষয়ে মো. মমিনুল ইসলাম মামুনের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

