আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০ মে ২০২৪ সালে ভারতের রেল ইন্ডিয়া টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক সার্ভিস (আরআইটিইএস) লিমিটেডের সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের ২০০টি আধুনিক স্টেইনলেস স্টিলের ব্রডগেজ যাত্রীবাহী বগি কেনার চুক্তি সই হয়।
তবে প্রকল্প নথির ভেতর লুকানো খরচের হিসাব সামনে আসতেই চরম দুর্নীতির ভয়াবহ রূপ উন্মোচিত হয়েছে।
যাত্রীদের সেবার মান বাড়ানোর নামে নেওয়া এই প্রকল্পে নজিরবিহীন অর্থ আত্মসাতের ফাঁকফোকর তৈরি করা হয়েছে, যা স্বাভাবিক ব্যয়ের তুলনায় শতগুণ বেশি বলে মনে করছেন রেল সংশ্লিষ্টরা।
যাত্রীদের দুর্দশা লাঘব আর রেলের গতি ফেরানোর স্বপ্ন দেখিয়ে ২০ মে ২০২৪ সালে রাজধানীর রেলওয়ে ভবনে জমকালো আয়োজনে সই হয়েছিল একটি চুক্তি।
ভারতের পাঞ্জাবের কাপুরথালা রেল কোচ ফ্যাক্টরি থেকে ২০০টি অত্যাধুনিক, দুর্ঘটনা প্রতিরোধী ব্রডগেজ বগি সরবরাহ করবে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ‘আরআইটিইএস (RITES) লিমিটেড’।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের এ উদ্যোগে ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ২৯৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। বর্তমানে এই চুক্তির প্রথম চালানের ১৯টি বগি দর্শনা সীমান্তে অপেক্ষায় থাকলেও, প্রকল্পের নথিপত্র খুলতেই বেরিয়ে এসেছে হাড়হিম করা তথ্য।
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ আর্থিক নথি ও পর্যালোচনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বগি কেনার নামে এমন কিছু অবাস্তব ও অনিয়মভিত্তিক খরচ যুক্ত করা হয়েছে, যা নিছক প্রশাসনিক ভুল নয়-বরং সরাসরি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরির পরিকল্পিত কৌশল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অবিশ্বাস্য অসংগতি: ৩টি গাড়ি ভাড়া ৩০০ কোটি টাকা!
প্রকল্প দলিলে যুক্ত করা অতিরিক্ত খরচের খাতগুলো দেখে থ বনে গেছেন আর্থিক বিশ্লেষকরা। সরকারি নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, একটি জিপ, একটি মাইক্রোবাস এবং একটি সেডান গাড়ি ভাড়া বাবদ কর ও ভ্যাটসহ খরচ দেখানো হয়েছে অবিশ্বাস্য ৩০০ কোটি টাকা।
নথিতে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ক্যারেজ ও ওয়াগন কারখানা, পার্বতীপুর এবং ঈশ্বরদীতে কমিশনিং ও প্রক্রিয়াকরণ বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৯০ হাজার পনেরো কোটি ২৭ লাখ টাকা।
মূল প্রকল্পের বাইরে ১৩৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি সংগতিহীন ‘চতুর্থ রিলিফ ক্রেন’ যুক্ত করা হয়েছে। এর বিপরীতে রিলিফ ক্রেন সংক্রান্ত পরামর্শক ফি ধরা হয়েছে ৯০১ কোটি ২০ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, ইলেকট্রিক সাব-স্টেশন ও চারটি হুইল লেদ মেশিনের বিদ্যুতায়নে ৬০০ কোটি এবং ২০০টি এমজি বগির নকশা যাচাই ও পরামর্শক বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে ২১৪ কোটি ২২ লাখ টাকা।
হুবহু নকল তথ্য ও ২২১টি ভুল
গত ২৪ জুনের এক পর্যালোচনায় আর্থিক নথিতে অন্তত ২২১টি মারাত্মক ভুল চিহ্নিত হয়। এক আর্থিক বিশ্লেষক জানান, নির্দিষ্ট কাজ ছাড়াই একজন পরামর্শকের ৪৮ মাসের সম্মানি ধরা হয়েছে ৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
অন্যান্য পরামর্শকের ফি এবং ক্রেন ও লেদ মেশিনের পরামর্শক ফি দশমিকের পর ছয় ঘর পর্যন্ত অবিকল অন্য এক রেলপথ নির্মাণ চুক্তি থেকে হুবহু কপি করে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করে ক্রয় পরিকল্পনার প্রধান তিনটি প্যাকেজের ব্যয়-সংক্রান্ত তথ্য রহস্যজনকভাবে ফাঁকা রাখা হয়েছে।
বগি আসার আগেই বিলাসী খরচ ও তড়িঘড়ি অর্থ ছাড়:
২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের জুন মেয়াদে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের (ইআইবি) অর্থায়নে ১,৬২৬ কোটি টাকার মূল পরিকল্পনা করা হলেও বাস্তবে অগ্রগতি শূন্য। অথচ বগি দেশে পৌঁছানোর আগেই প্রকল্প কার্যালয়ের জন্য কম্পিউটার, প্রিন্টার ও আসবাবপত্র কিনতে ৩৫ লাখ টাকা উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মূল যন্ত্রপাতি সরবরাহের চুক্তি সইয়ের আগেই প্রথম দুই বছরে মোট বরাদ্দের ৭০ শতাংশ বা ৮২৯ কোটি ১২ লাখ টাকা ছাড় করার অদ্ভুত শর্ত রাখা হয়েছে।
ব্যাংক-সংক্রান্ত ব্যয়ের খাতটি কোনো দরপত্র ও ঋণদাতার তদারকি ছাড়াই রাখা হয়েছে, যা সরাসরি স্থানীয় মুদ্রায় উত্তোলনের সুযোগ দেয়। সূত্র-এসএস
নীরব দায়িত্বশীলরা
প্রকল্পে চরম অনিয়ম ও অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) জয়দুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি।
পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে কয়েকটি বার্তা পাঠিয়ে মন্তব্য জানার চেষ্টা করেছি। কয়েকদিন অপেক্ষা করার পরও তিনি সাড়া দেননি। পরবর্তীতে তিনি বক্তব্য প্রদান করলে প্রতিবেদনে তা যুক্ত করা হবে।
রেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতের মতো এসব ভয়াবহ ক্রয়-দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে পাঠানোর আশঙ্কা রয়েছে।
অনিয়ম বন্ধ ও দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনতে অবিলম্বে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করে কঠোর ও নিরপেক্ষ তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

