প্রকৃতির রুদ্ররূপে এক লহমায় বদলে গেছে হিমালয়ের কোলঘেঁষা উপত্যকাগুলোর চিত্র। শান্ত, স্নিগ্ধ পর্বতমালা এখন রূপ নিয়েছে এক বিশাল মৃত্যুপুরীতে।
বুধবার সকালে হঠাৎ হিমবাহ ধসে পড়ার পর প্রচণ্ড শক্তিতে নদীগুলোতে নেমে আসে পাথর, বরফ ও কাদার মারাত্মক প্লাবন। সেই জলপ্রলয়ে নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে সৃষ্টি হয়েছে এক অভূতপূর্ব ভয়াবহতা।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকালে নেপাল পুলিশের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপি জানায়, প্রলয়ঙ্করী এ বন্যায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬৯ জনে। প্রকৃতির এই আকস্মিক ধ্বংসলীলায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন নেপাল ও তিব্বতের প্রায় ১,০০০ মানুষ।
বন্যার তীব্র স্রোতে মুহূর্তের মধ্যে ভেসে গেছে একের পর এক শান্ত গ্রাম, বিধ্বস্ত হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এবং সেতু।
কাঠমান্ডুর সঙ্গে তিব্বতের লাসাকে যুক্ত করা পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের অত্যন্ত প্রিয় যোগাযোগপথটি এখন স্রেফ ধ্বংসস্তূপে পরিণত।
নেপাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫১৪ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
দুর্গত এলাকাগুলোতে চলছে উদ্ধারকর্মীদের জীবনপণ লড়াই। প্রশিক্ষিত কুকুরের সাহায্যে কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে প্রাণের সন্ধান করছেন জরুরি উদ্ধারকর্মীরা।
দূরবর্তী ও দুর্গম উপত্যকায় আটকে পড়া হাজার হাজার বিপন্ন মানুষের কাছে আকাশ ও স্থলপথে পৌঁছানো হচ্ছে জরুরি ত্রাণ। ভেসে যাওয়া অনেক মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে বহু দূরের সমতল এলাকা থেকে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া শহর থেকে বৃহস্পতিবার অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার করা হয় দিবগা তামাং নামের এক ব্যক্তিকে।
তবে জীবন ফিরে পেলেও স্বজন হারানোর বেদনায় বাকরুদ্ধ তিনি। আকুল কণ্ঠে তামাং বললেন, আমাদের সব মানুষ চলে গেছে। তারা মারা গেছে-আমার জন্য অপেক্ষা করার মতো আর কেউ নেই।
সামনে কি আরও বড় কোনো প্রলয়?
সংকট এখনই শেষ হচ্ছে না, বরং আরও এক ভয়াবহ দুর্যোগের প্রহর গুনছে পুরো অঞ্চল।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানিয়েছে, বন্যার পানির সাথে নেমে আসা কাদা ও ধ্বংসাবশেষ জমে বন্যাকবলিত ভোতেকোশি নদীর ওপর তৈরি হয়েছে কৃত্রিম এক হ্রদ। সেখানে হু হু করে বাড়ছে পানির উচ্চতা। যেকোনো মুহূর্তে কৃত্রিম এই বাঁধ ভেঙে নেমে আসতে পারে আরও বড় বিপর্যয়।
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের গবেষক ঝু জিনফেং সিসিটিভি-কে সতর্ক করে বলেছেন, পানির পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে, একইসঙ্গে বাড়ছে মহাবিপদের ঝুঁকি।
বেইজিং জানিয়েছে, আগামী তিন দিনের মধ্যে ওই জলাধারে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি প্রবেশ করতে পারে-যা প্রায় ১,২০০টি অলিম্পিক সুইমিং পুলের পানির সমান।
আগামী ১ সেপ্টেম্বর এই কৃত্রিম হ্রদের পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রকৃতি যেখানে একদিকে স্বজন হারানোর আর্তনাদে ভারী, অন্যদিকে ঝুলছে নতুন এক মহাবিপর্যয়ের শঙ্কা।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

