মেগা প্রকল্পে ‘মেগা’ হরিলুট: দুদকের নজরে রেলের প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল

প্রকাশিত: ০৩ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৪০

দেশ যখন বিশাল অংকের ঋণ নিয়ে মেগা অবকাঠামো গড়ার স্বপ্নে বিভোর, ঠিক তখনই বাংলাদেশ রেলওয়ের ভেতরে গড়ে উঠেছিল এক ছায়াসাম্রাজ্য। ফাইল আটকে কমিশন আদায়, কাজের মান না দেখেই বিল ছাড় এবং সেই টাকায় দেশ-বিদেশে তৈরি করা হয়েছে সম্পদের পাহাড়। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে উঠা এমন নজিরবিহীন দুর্নীতির তথ্যে তোলপাড় শুরু হয়েছে প্রশাসনে।

বিশেষ প্রতিবেদন : বাংলাদেশ রেলওয়ের বড় বড় মেগা প্রকল্প যেখানে জাতীয় অর্থনীতির গতি ঘোরানোর কথা ছিল, সেখানে তা পরিণত হয়েছিল ব্যক্তি বিশেষের পকেট ভরার হাতিয়ারে।

রেলওয়ের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্ব সামলে ঠিকাদারদের সহায়তায় এক শক্তিশালী ‘কমিশন সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) প্রেরিত অভিযোগ অনুসন্ধানে উন্মোচিত হচ্ছে এই প্রকৌশলীর অবৈধ অর্থবিত্ত ও পাচারের রোমহর্ষক খতিয়ান।

মেগা প্রকল্পের আড়ালে শত কোটির ‘কমিশন’ বাণিজ্য

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণ প্রকল্প এবং আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন প্রকল্প-এই দুই মেগা প্রকল্পে তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. তানভীরুল ইসলাম।

দায়িত্ব পালনের আড়ালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন আদায়কে তিনি বাধ্যতামূলক নিয়মে পরিণত করেছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারদের কাজের বিল আটকে রাখা, ফাইল মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখা এবং অযথা নানা অহেতুক ত্রুটি বের করাই ছিল তাঁর প্রধান অস্ত্র।

আর কমিশন হাতবদল হওয়ামাত্রই কাজের গুণগত মান কিংবা অগ্রগতি যাচাই ছাড়াই তড়িঘড়ি করে ছাড় করা হতো সরকারি অর্থ।

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, কেবল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণ প্রকল্প এবং আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন প্রকল্প, এই দুই প্রকল্প থেকে শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

প্রকল্পগুলোর মেজারমেন্ট বুক (এমবি), বিল ভাউচার ও পরিশোধসংক্রান্ত নথিপত্র খতিয়ে দেখলে এই হরিলুটের প্রকৃত গভীরতা উন্মোচিত হবে।

বিদেশে অর্থ পাচার ও স্বজনদের নামে সম্পদ:

অভিযোগ রয়েছে, দেশ থেকে লুট হওয়া এই বিপুল অর্থের বড় একটি অংশ হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করা হয়েছে বিদেশে। দেশেও গড়েছেন সম্পদের দুর্গ। নিজ জেলায় একটি বিলাসবহুল বাড়ি এবং নিজের নামে তিনটি বিলাসবহুল গাড়ি থাকার অভিযোগও উঠে আসে।

শুধু নিজের নামে নয়, পরিবারের সদস্যদের নামেও বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দুদকের একটি সূত্রও বলছে, অভিযোগ পেয়ে সকল তথ্য অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

চট্টগ্রামের একটি দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ করা হয়, স্ত্রী রাফিয়া আক্তারের নামে বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি কেনা হয়েছে। স্বজনদের নামেও একাধিক স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

রাজধানী ঢাকায় দুটি বহুতল ভবন থাকার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দুদকের অনুসন্ধান এড়াতেই এসব সম্পদ নিকট আত্মীয়দের নামে রাখা হয়েছে।তবে এসব সম্পদ সরাসরি মো. তানভীরুল ইসলামের মালিকানাধীন কি না, নাকি নিকট আত্মীয়দের নামে রাখা হয়েছে-সেটিও তদন্তের বিষয়।

তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে-একজন সরকারি প্রকৌশলীর ঘোষিত আয়, চাকরিজীবনের বৈধ উপার্জন ও কর-নথির সঙ্গে দেশে-বিদেশে কথিত সম্পদের সামঞ্জস্য কতটা?

সংশ্লিষ্টদের মতে, তানভীরুল ইসলাম, তাঁর স্ত্রী-সন্তান এবং নিকটাত্মীয়দের আয়কর নথি ও ব্যাংক হিসাব পুরোপুরি জব্দ করে পর্যালোচনা করলেই উঠে আসবে থলে থেকে বিড়াল।

‘ভোলবদল’ ও পদ বাগানো

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজের পিঠ বাঁচাতে তানভীরুল ইসলাম কৌশল বদলে ফেলেন রাতারাতি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দাপুটে সুবিধাভোগী এই কর্মকর্তা নতুন প্রেক্ষাপটে নিজের প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠেন।

অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী কয়েকজন ঠিকাদারের আর্থিক সহযোগিতায় বিপূল অর্থ লেনদেন করে বাগিয়ে নেন বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলীর পদ।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই অর্থে বিনিয়োগ করেছিল যাতে ভবিষ্যতে আরও বড় বড় প্রকল্পের বিল অনায়াসে বাগিয়ে নেওয়া যায়।

উত্তাপিত এসব বিস্ফোরক অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, তানভীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আসা নথিগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে।

খুব শিগগিরই তাঁর দায়িত্বকালীন প্রকল্পসমূহের আর্থিক লেনদেন ও ব্যাংক বিবরণী পর্যালোচনার চূড়ান্ত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব) মো. তানভীরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অভিযোগে যা উল্লেখ করা হয়েছে সবকিছুই বানোয়াট, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।

তাছাড়া কোন একটি অসাধু চক্র আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্যই এমন মিথ্যা ভিত্তিহীন আজগুবি তথ্য পেশ করে গণমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। সম্পদের বিষয়ে তিনি বলেন, যেসব দেশে আমার কখনো যাওয়া হয়নি সেখানে সম্পদ কিভাবে গড়বো?

অন্যদিকে, পুরো বিষয়টিতে রেলওয়ের শীর্ষ পর্যায়ের অবস্থান জানতে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।সূত্র ডিএস

রেলওয়ের মতো স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় সেবা সংস্থায় এমন প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট বন্ধে এবং পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট নজরদারি সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় দেশবাসী।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি