চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, আগামী দিনে দেশে যে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে, তার সঙ্গে ঈদের কোনো সম্পর্ক নেই। জনগণের যখনই প্রয়োজন হবে, আন্দোলনের ডাক তখনই আসবে।
শনিবার রাতে লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ড. কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম।
সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষের দেওয়া গণরায়কে অস্বীকার করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। সেই গণআকাঙ্ক্ষা ও রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কোনো বিরতি বা থামাথামি ছাড়াই লড়াই চালিয়ে যাওয়া হবে।
তিনি একই সঙ্গে আন্দোলনের গতি রুদ্ধ করতে আসা যেকোনো ধরনের লোভ বা প্রলোভন সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণা দেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই সরকার জনগণকে কোনো স্বস্তি দিতে পারেনি। বর্তমানে দেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট থাকলেও গ্রাহকদের নিয়মিত ভৌতিক বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। তেল ও জ্বালানির জন্য চতুর্দিকে হাহাকার চলছে। পাশাপাশি দলীয় আনুকূল্যে সন্ত্রাস ও রাহাজানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জনগণের ৭০ ভাগের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন করতে হবে এবং তা আদায় করে ছাড়া হবে। তাঁর ভাষায়, “এর আগে আমরা বিরতি দেব না, আমরা থামব না। এ লড়াই আমাদের চলবে এবং বাংলাদেশও ইনশাল্লাহ বদলাবে।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরকারের প্রতি রাজনৈতিক সমঝোতার আহ্বান জানিয়ে বলেন, স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া সমস্যার সমাধান যদি সরকার করতে না পারে, তবে প্রথমে জনগণের কাছে তা স্বীকার করতে হবে।
তিনি বলেন, স্বীকার করতে হবে যে, এই সমস্যার সমাধান একার পক্ষে সম্ভব নয়। দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে সেটিও স্বীকার করা উচিত। অবিলম্বে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। বিরোধী দল সমর্থন না দিলে এই দেশ একা চালানো সম্ভব নয়-এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, তারা পতিত স্বৈরাচারকে ফিরে আসার কোনো পথ করে দিচ্ছেন না, বরং সরকারই সেই পথ তৈরি করছে। কারণ জনগণকে সমস্যার সমাধান দেওয়া যাচ্ছে না এবং তাদের হক আদায় করা যাচ্ছে না।
এর ফলে জনগণ বিকল্প খুঁজছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই বিকল্প শক্তি কারা, তা আজকের লংমার্চে বাংলাদেশের জনগণ দেখেছে।
তিনি বলেন, পতিত স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তারা যেমন ঐক্যবদ্ধ, তেমনি নতুন কোনো রাস্তা বাংলাদেশে তৈরি হতে দেওয়া হবে না। পতিত স্বৈরাচার কোনোভাবেই দেশে ফিরতে পারবে না।
সভাপতির বক্তব্যে ড. কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেন, তারা নিজেদের স্বার্থে নয়, দেশের মানুষের স্বার্থে রাজপথে এসেছেন।
তিনি বলেন, তারা একটি সন্ত্রাসমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও সুশাসনের বাংলাদেশ গড়তে চান। বর্তমান পরিস্থিতিতে ১১ দলীয় জোট ছাড়া অন্য কারও পক্ষে এমন বাংলাদেশ দেওয়া সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করে ড. কর্নেল অলি আহমদ বলেন, দেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়েছে, ব্যাংকে কোনো টাকা নেই এবং প্রতিদিন নতুন নোট ছেপে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বর্তমান প্রশাসনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ক্ষমতায় আসার আগে ছয় মাসের মধ্যে এক লাখ মানুষকে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ক্ষমতায় আসার পর উল্টো এক লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, ক্ষমতার মসনদে বসার পর বিএনপি জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে গাদ্দারি ও বিশ্বাসভঙ্গ করেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, তারা দেশের সঙ্গে, ইতিহাসের সঙ্গে এবং দেড় সহস্র শহীদের রক্তের সঙ্গে গাদ্দারি করেছে।
মামুনুল হক বলেন, এখন মহান সংসদে দাঁড়িয়ে বিএনপির মুখপাত্রের মুখে শুনতে হয় যে, তারা গণভোট মন থেকে বা আন্তরিকভাবে সংস্কার করার ঐকমত্য পোষণ করেনি। বরং শুধুমাত্র নির্বাচন আদায় করাই ছিল বিএনপির আসল উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, চট্টগ্রামের এক নেতা বলেছিলেন, লংমার্চের ব্যাপারে ছাড় দেওয়া হবে না। কিন্তু পথে পথে যে জনসমুদ্র দেখা গেছে, তাতে স্পষ্ট হয়েছে-জনগণ আপনাদের ছাড় দেবে না।
তিনি অবিলম্বে জুলাই সনদ মেনে জনদাবি পূরণের আহ্বান জানান।
মাগরিবের পর থেকে শুরু হয় সমাবেশের মূলপর্ব। এ সময় বক্তব্য রাখেন এনসিপির মূখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ কে এম হামিদুর রহমান আজাদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালাল উদ্দীন আহমদ, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, লেবার পার্টির মুখপাত্র মাওলানা নাজমুল ইসলাম তালুকদার, দীর্ঘদিন গুমের শিকার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর রহমান বীরপ্রতীক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মুহাম্মদ ফয়সাল, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলাম।
এর আগে আসরের পর থেকে মাগরিবের আগে পর্যন্ত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি মাওলানা এমদাদুল্লাহ সোহাইল, চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরী আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ওমর ফারুক, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম, চাকসুর ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও চট্টগ্রাম অঞ্চল টিম সদস্য জাফর সাদেক, এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগরের আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইব, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি চট্টগ্রাম মহানগরী আমির মাওলানা জিয়াউল হোসাইন, ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম মহানগর দক্ষিণের সভাপতি মাইমুনুল ইসলাম মামুন, এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের যুগ্ম আহ্বায়ক খান তালাত মাহমুদ রাফি, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির আনোয়ারুল আলম চৌধুরী, জাগপার চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি আবু মোজাফফর মোহাম্মদ আনাস, লেবার পার্টির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি, চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আলী, এলডিপি চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি সৈয়দ গিয়াস উদ্দিন আলম, এবি পার্টি চট্টগ্রাম মহানগরীর আহ্বায়ক এডভোকেট গোলাম ফারুক, এলডিপির চট্টগ্রাম মহানগরীর সহ সভাপতি এডভোকেট আবদুল মোতালেব ও খেলাফত মজলিসের নেতা আতিক বিন ওসমান।
সমাপনী সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, এনসিপি নেত্রী ডা. মাহমুদা মিতু এমপি, সেগুফতা বুশরা মিশমা, জামায়াত নেতা ইয়াছিন আরাফাত, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন এর কেন্দ্রীয় সভাপতি আতিকুর রহমান, জামায়াত নেতা মোবারক হোসেন, অধ্যাপক আহছানুল্লাহ ভুঁইয়া, অধ্যাপক নুরুল আমিন চৌধুরী প্রমুখ।
১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বগতি রোধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।
এই দাবিগুলো সামনে রেখেই সকালে ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ শুরু হয়। পথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা, সংবর্ধনা ও অভিবাদন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে লংমার্চটি চট্টগ্রামে এসে পৌঁছায়।
পথে পথে কর্মসূচি, শেষে লালদীঘিতে সমাপ্তি
লংমার্চের পথে বেশ কয়েকটি পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ছিল নারায়ণগঞ্জের কাচপুর ব্রিজসংলগ্ন ট্রাকস্ট্যান্ড, কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহীপাল ও মীরসরাই। সবশেষে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত সমাপনী জনসভার মধ্য দিয়ে শেষ হয় ১১ দলীয় ঐক্যের এই লংমার্চ কর্মসূচি।
এর আগে গত ৬ আগস্ট ঢাকার মুক্তাঙ্গনে জোটের এক অবস্থান কর্মসূচি থেকে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা থেকে চারটি বিভাগীয় শহরে ‘লং মার্চ’ ও মহাসমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেন জোটের শীর্ষ নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর ডা. আমির শফিকুর রহমান।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটে (রেলপথে) লং মার্চ শেষে ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার কথা রয়েছে।


