ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সেই বহুল পরিচিত উক্তি—“ভালো হয়ে যাও মাসুদ”—এর মূল চরিত্র এবং চট্টগ্রাম বিআরটিএর বিভাগীয় পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. মাসুদ আলমকে অবশেষে ঢাকা বিভাগীয় অফিসে বদলি করা হয়েছে। দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে কর্মরত থেকে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আয় করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অতীতে বিভিন্ন মহলের প্রভাবে তার একাধিক বদলির আদেশ ধামাচাপা পড়লেও, জনস্বার্থে জারি করা সর্বশেষ ৩১ আগস্টের আদেশে তাকে চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে ঢাকা বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে।
বিআরটিএর চেয়ারম্যানের কার্যালয় থেকে গত ৩১ আগস্ট জারি করা এক অফিস আদেশে এই রদবদলসহ আরও বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়িত্বে পরিবর্তন আনা হয়। জনস্বার্থে জারি করা এই আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
রদবদলের বিস্তারিত চিত্র
মো. মাসুদ আলম: চট্টগ্রাম বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) থেকে তাকে ঢাকা বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) পদে বদলি করা হয়েছে।
শফিকুজ্জামান ভূঞা: ঢাকা বিভাগীয় অফিস থেকে তাকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) পদে পদায়ন করা হয়েছে।
মো. জিয়াউর রহমান: খুলনা বিভাগীয় অফিসের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) থেকে তাকে বিআরটিএ সদর কার্যালয়ের পরিচালক (রোড সেফটি) পদে বদলি করা হয়েছে এবং তাকে বরিশাল বিভাগীয় অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তানভীর আহমেদ: খুলনা বিভাগীয় অফিসের উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) পদে থেকে নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি ওই বিভাগের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং)-এর অতিরিক্ত দায়িত্ব পেয়েছেন।
মার্চের বদলি আদেশ বাতিলের নেপথ্য রহস্য
এর আগে চলতি বছরের ৭ মার্চ বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মো. মাসুদ আলমকে সদর কার্যালয়ের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) পদে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একই আদেশে সদর কার্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহকে পরিচালক (রোড সেফটি) পদে দায়িত্ব দেওয়ার কথা ছিল। তবে সেই আদেশ শেষ পর্যন্ত রহস্যজনক কারণে বাস্তবায়িত হয়নি। বিআরটিএর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া না হলেও, প্রভাবশালী মহলের তদবির ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ওই আদেশ বাতিল করানো হয়েছিল বলে সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ সূত্রে অভিযোগ রয়েছে।
‘ভালো হয়ে যাও মাসুদ’ থেকে ভাইরাল পরিচিতি
২০১৭ সালে তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের একটি মন্তব্যের জেরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশজুড়ে আলোচিত হন মো. মাসুদ আলম। মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়ে সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগের ভিত্তিতে মন্ত্রী তাকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘ভালো হয়ে যাও মাসুদ।’ পরবর্তী সময়ে মন্ত্রীর সেই বক্তব্যের ভিডিও ভাইরাল হলে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ওই সময় ওবায়দুল কাদের মন্তব্য করেছিলেন যে মাসুদের ব্যবহার মধুর মতো হলেও তিনি যা করার ‘ভিতরে ভেতরে’ করেন। এরপর থেকেই মাসুদ আলমের কর্মকাণ্ড ও দীর্ঘমেিয়াদি একচ্ছত্র অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনার জন্ম হয়েছে।
স্বচ্ছতার অভাব ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
২০২৪ সালের ২৫ মার্চ চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক হিসেবে যোগদানের পর দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে একই স্টেশনে বহাল ছিলেন মাসুদ আলম। বিআরটিএর অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর মতে, সংস্থাটির অধিকাংশ বদলি ও পদায়নের অফিস আদেশ নিয়মিত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি তৈরি করে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোাইন মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিআরটিএতে বদলি ও পদায়নে নীতিমালা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা অতীব জরুরি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকার বদলায়, কিন্তু বিআরটিএর এই পুরোনো সংস্কৃতি বদলায় না; প্রভাবশালী কর্মকর্তারা একই গ্রেডে বারবার গুরুত্বপূর্ণ পদ আঁকড়ে থাকেন।’
এদিকে সাম্প্রতিক এই বদলি ও বর্তমান পদায়ন নিয়ে বিআরটিএর সাবেক চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক এবং বর্তমান ঢাকা বিভাগীয় অফিসের পরিচালক মো. মাসুদ আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


