বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাসে ধস: সিন্ডিকেট ও লাইটারেজ সংকটে জিম্মি দেশের আমদানি বাণিজ্য!

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৬:১২

বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ আর দিগন্তবিস্তারী জলরাশির মাঝে অলস দাঁড়িয়ে আছে একের পর এক বিশাল আকৃতির মাদার ভেসেল।

নাব্যতা সংকটের কারণে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন কাঁচামাল নিয়ে আসা এই বিশাল জাহাজগুলো চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান জেটিতে ভিড়তে পারে না।

নিয়মানুযায়ী, এসব জাহাজের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পণ্য বহির্নোঙরেই ছোট লাইটারেজ জাহাজে খালাস করতে হয়।

কিন্তু বঙ্গোপসাগরের মাঝপথে এসে থমকে গেছে দেশের আমদানি পণ্যের মূল রক্তপ্রবাহ। একদিকে বৈরী আবহাওয়া, অন্যদিকে তীব্র লাইটারেজ জাহাজ সংকট-এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বহির্নোঙরে সৃষ্টি হয়েছে নজিরবিহীন স্থবিরতা।

বর্তমানে খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন জরুরি পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অপেক্ষায় দিন গুনছে প্রায় ৫৫টি মাদার ভেসেল। এর মধ্যে একটি লাইটারেজ জাহাজও না পেয়ে পুরোপুরি অলস বসে আছে ১৬টি মাদার ভেসেল। আর বাকি জাহাজগুলো যেটুকু লাইটার পাচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, একটি ৫০ হাজার টনের মাদার ভেসেলের জন্য দিনে গড়ে ৩ থেকে ৪টি লাইটারেজ প্রয়োজন। চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন সার্বিক চাহিদা থাকে ১৫০ থেকে ২০০টি লাইটার জাহাজের। গত এক সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৪০টি জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিগত রবিবার এই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ২০টিতে।

যে জাহাজ ৮ থেকে ১০ দিনে খালাস হওয়ার কথা, তা খালাস করতে সময় লাগছে ২০ থেকে ২৫ দিন। ফলে প্রতিটি জাহাজকে অতিরিক্ত ১৫ দিন সাগরে অলস বসে থাকতে হচ্ছে।

চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি মাদার ভেসেলকে দিনে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ লাখ টাকা) পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার খেসারত বা ‘ডেমারেজ’ গুনতে হচ্ছে।

সিন্ডিকেট, মামলা-ভীতি ও জাহাজ কেটে বিক্রির নেপথ্য কারণ

শিল্পগ্রুপগুলো নিজস্ব লাইটারেজ দিয়ে কিছু পণ্য খালাস করলেও অধিকাংশ সাধারণ আমদানিকারক নির্ভর করেন ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি)-এর ওপর।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই সংকটের নেপথ্যে রয়েছে বিডব্লিউটিসিসির অব্যবস্থাপনা এবং গুটিকয়েক জাহাজ মালিকের কায়েমি সিন্ডিকেট। শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা সংকট নিরসনে বিদ্যমান ‘সিরিয়াল প্রথা’ অবিলম্বে বাতিল করে জাহাজ বরাদ্দ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।

ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, একসময় দেশে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার লাইটারেজ জাহাজ সচল ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে।

গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মামলা ও হয়রানির আশঙ্কায় সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী অনেক ব্যবসায়ী নিজেদের লাইটার জাহাজ কেটে স্ক্র্যাপ হিসেবে শিপইয়ার্ডে বিক্রি করে দিয়েছেন। ফলে নৌপথে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতায় বিশাল বড় ধস নেমেছে।

সংকটের সত্যতা স্বীকার করে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের কর্মকর্তা পারভেজ আহমেদ জানান, বৈরী আবহাওয়া ও বিভিন্ন ঘাটে জাহাজ আটকে থাকার পাশাপাশি প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০টি লাইটারেজ জাহাজ নিয়ম ও সিরিয়ালের বাইরে চলায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা সমুদ্রে বিশেষ টিম নামাচ্ছেন। ছাড়পত্র ছাড়া অবৈধভাবে চলাফেরা করা জাহাজগুলোকে চিহ্নিত করে ডিজি শিপিংয়ের মাধ্যমে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। সূত্র-এখন

ইতোমধ্যেই নৌ বাণিজ্য দপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার শেখ জালাল উদ্দিন গাজীও জানিয়েছেন, নৌপথে পণ্য পরিবহনে অনিয়মের দায়ে ৫৬টি লাইটার জাহাজের ‘বে-ক্রসিং’ লাইসেন্স স্থগিত করেছে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর।

এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণে অ্যাপভিত্তিক আধুনিক ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সহ-সভাপতি মশিউল আলম স্বপন বলেন, ডিজি মহোদয়ের নেওয়া অ্যাপভিত্তিক উদ্যোগটি যদি সবাই সহযোগিতা করে বাস্তবায়ন করে, তবে সমস্যার বড় একটি অংশ সমাধান হয়ে যাবে।

একইসঙ্গে ডব্লিউটিসির নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা যদি সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সব মালিকের স্বার্থ রক্ষা করে কাজ করেন, তবে এই অচলাবস্থা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

বহির্নোঙরে প্রতিটি দিন বিলম্ব হওয়া মানেই দেশের শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাগরে ভেসে যাওয়া, যার চূড়ান্ত প্রভাব গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তার পকেটে।

দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে লাইটারেজ সংকটের এই সিন্ডিকেট ভাঙা এবং নৌপথে শৃঙ্খলা ফেরানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি