খুলশীতে হিজড়া গুরুমা মৌসুমী হত্যায় ধরা পড়ল কথিত স্বামী রনি

গরুর খামারের টাকাই কি ডেকে আনল কাল?

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:৩৫

চট্টগ্রামের খুলশী থানার আমবাগান রেলওয়ে কলোনির নিঝুম এক রাত। চারপাশের কোলাহল তখন একদম শান্ত। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার সুযোগ নিয়েই ঘটে গেল এক নৃশংস ও হৃদয়বিদারক ঘটনা।

নিজ ঘরে একা থাকা হিজড়া সম্প্রদায়ের শ্রদ্ধেয় নেত্রী ও ‘গুরুমা’ নামে পরিচিত মোহাম্মদ মহসীন ওরফে মৌসুমী হিজড়াকে (৫২) মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের পর রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে এলাকার একটি গোপন সিসিটিভি ফুটেজ, যার ওপর ভিত্তি করে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে প্রধান সন্দেহভাজন মো. মোমিন ওরফে শেখ রনিকে (৩৪)।

নিহত মৌসুমী হিজড়ার মূল বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে হলেও দীর্ঘদিন ধরে তিনি আমবাগান রেলওয়ে কলোনিতে বসবাস করছিলেন।

হিজড়া সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তিনি নিজের বাসার পেছনে গড়ে তুলেছিলেন একটি গরুর খামার। ৪ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার তিনি খামারের একটি গরু বিক্রি করে সেই নগদ বিপুল পরিমাণ অর্থ ঘরে রেখেছিলেন। পরের দিন শনিবার সকালে তাঁর আরও গরু কেনার পরিকল্পনা ছিল।

ঘটনার রাতে প্রতিবেশীরা ভোররাতের দিকে মৌসুমীর ঘর থেকে উচ্চবাচ্যের শব্দ পেয়েছিলেন। কিন্তু পরিচিত কেউ এসেছে ভেবে বিষয়টি তারা অতটা পাত্তা দেননি। কিন্তু শনিবার সকালে যখন সূর্য অনেক উঁচুতে ওঠে, তখনও ঘর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মিলছিল না।

সন্দেহ জাগলে হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্য পাখি রহমান ঘরে ঢুকে দেখতে পান এক বিভীষিকাময় দৃশ্য-মৌসুমীর মুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, চোখ দুটো ফোলা এবং জিহ্বা বেরিয়ে আছে। সাথে সাথেই খবর দেওয়া হয় খুলশী থানা পুলিশকে। পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে।

ঘটনার তদন্তে নেমে খুলশী থানা পুলিশ আমবাগান এলাকার একটি সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার করে। ফুটেজে দেখা যায়, ঘটনার রাতে অর্থাৎ ৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত ১টা ১৪ মিনিটে সাদা টি-শার্ট পরা এক যুবক অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মৌসুমীর ঘরে প্রবেশ করেন।

প্রায় দীর্ঘ তিন ঘণ্টা ঘরের ভেতর তাণ্ডব চালিয়ে ভোর রাত ৩টা ৫২ মিনিটে তিনি বের হয়ে যান। পুলিশ প্রখর সুক্ষ্মতায় ফুটেজ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয় যে, ওই নিশাচর যুবক আর কেউ নন-তিনি মো. মোমিন।

গ্রেপ্তারকৃত মোমিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল থানার সব্দলপুর গ্রামের বাসিন্দা। সম্প্রতি তিনি পাহাড়তলী এলাকার পাঠানপাড়ায় ফাল্গুনী হিজড়া নামের অপর এক নেত্রীর বাসায় থেকে তাঁর ‘কথিত স্বামী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই মৌসুমীর ঘরে থাকা গরু বিক্রির সমস্ত নগদ অর্থ এবং তাঁর ব্যবহৃত দুটি মূল্যবান মোবাইল ফোন উধাও হয়ে গেছে।

পুলিশের ধারণা, খামারের গরু বিক্রির বিপুল অঙ্কের টাকা এবং মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে।

খুলশী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গোলাম মোহাম্মদ নাসিম জানান, সিসিটিভি ফুটেজের অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতেই সন্দেহভাজন মোমিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশি হেফাজতে আনা হয়েছে।

বর্তমানে তাঁকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল কারণ উন্মোচন এবং খোয়া যাওয়া টাকা ও মোবাইল উদ্ধার করতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি