জালিয়াতির সিঁড়ি বেয়ে মহাব্যবস্থাপক-নথিপত্র গায়েব,অঢেল সম্পদের মালিক

স্ত্রীর ‘ভুয়া’ ব্যবসা থেকে ভারতে অর্থ পাচার

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২০:০১

চাকরির শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজন ছিল ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণীর স্নাতক ডিগ্রি। কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতায় তৃতীয় শ্রেণী থাকা সত্ত্বেও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনি লাল দাশ।

কেবল নিয়োগ জালিয়াতিই নয়, চাকরিজীবনে সততার আড়ালে গড়ে তুলেছেন বিপুল পরিমাণের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ। এমনকি গণমাধ্যমে দুর্নীতির খবর প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও ফাইল গায়েব করে দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিপিসির চাকরি থেকে ইতিমধ্যে অবসরে চলে গেছেন মনি লাল, কিন্তু তার অনিয়ম-দুর্নীতির বিচার এখনো হয়নি।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই বিষয়ে নিউজ হওয়ার পর জালিয়াতির তথ্য মুছে ফেলতে ফাইলগুলো গায়েব করে ফেলেছেন মনি লাল দাস। এখন আর এগুলোর হদিস মিলছে না। সংশ্লিষ্ট বিভাগের লোকজনও এমন শঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯৬ সালের ২৪ অক্টোবর দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী বিপিসির সহকারী ম্যানেজার পদে আবেদনের জন্য ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণীর স্নাতক পাস চাওয়া হলেও মনি লাল দাশের ফলাফল ছিল তৃতীয় শ্রেণী।

যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও অজ্ঞাত ক্ষমতার বলে ১৯৯৯ সালে সহকারী ব্যবস্থাপক (এমআইএস) হিসেবে প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেন তিনি।

পরবর্তীতে ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) এবং সর্বশেষ জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) পদে দায়িত্ব পালন করেন।

একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল লিমিডেটের (এসএওসিএল) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবেও বহাল ছিলেন তিনি।

চলতি বছরের ১৩ আগস্ট পিআরএলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত এই দীর্ঘ মেয়াদে নানা অনিয়ম ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

সবচেয়ে গুরুতর দিক উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে। সূত্রটি বলছে, ২০২৩ সালে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মনি লাল দাস বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পাওয়ার পর অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।

সংস্থাটির অনুসন্ধানে মণি লাল দাশ ও তাঁর স্ত্রী সেপিকা দাশের নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে মনি লাল দাশ ও তাঁর স্ত্রী সেপিকা দাশের নামে আড়াই কোটি টাকারও বেশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মনি লাল দাশের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও পারিবারিক ব্যয়সহ মোট ৪ কোটি ১৭ লাখ ২৭ হাজার ২০৭ টাকার সম্পদের বিপরীতে গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া গেছে ৩ কোটি ৪০ লাখ ৯২ হাজার ১৯৩ টাকা। অর্থাৎ, তাঁর ৭৬ লাখ ৩৫ হাজার ১৪ টাকার সম্পদের কোনো গ্রহণযোগ্য উৎস নেই।

অন্যদিকে, পেশায় গৃহিণী হয়েও সেপিকা দাশ ২০১০-১১ করবর্ষ থেকে নিবন্ধিত করদাতা হিসেবে নিজেকে সঞ্চয়পত্র, শেয়ার ব্যবসা, কমিশন ব্যবসা ও মৎস্য চাষী হিসেবে উল্লেখ করে আসছেন।

তবে অনুসন্ধানে কমিশন ব্যবসা বা মৎস্য চাষের কোনো অস্তিত্ব কিংবা উপযুক্ত নথি দাখিল করতে পারেননি তিনি।

মূলত স্বামীর অবৈধ উপার্জনকে বৈধ করতেই এসব ভুয়া ব্যবসায়িক পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে বলে তদন্ত সংস্থা স্পষ্ট করেছে।

সেপিকা দাশের ২ কোটি ৪৪ লাখ ৬১ হাজার ৯২৭ টাকার অর্জিত সম্পদের বিপরীতে ১ কোটি ৮৭ লাখ ১৭ হাজার ২৫৫ টাকার আয়ের কোনো বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও সহকারী পরিচালক রাজু আহমেদ অনুসন্ধান শেষে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের সুপারিশ করে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সম্প্রতি বিপিসির এ কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীর নামে পাওয়া জ্ঞাত আয় বহির্ভূত এসব সম্পদের তালিকাসহ একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। যেখানে আলোচ্য সম্পদগুলোর জন্য পৃথকভাবে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের নামে সম্পদ বিবরণী দাখিলের সুপারিশ করা হয়।

নিয়োগ নথিপত্র গায়েব এবং অর্থ পাচারের নানা অভিযোগ নিয়ে যোগাযোগ করা হলে তাঁকে পাওয়া যায়নি।

তবে এর আগেও ২০২৪ সালে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও অসংগতির অভিযোগ অস্বীকার করে মনি লাল দাশ চট্টগ্রামের একটি দৈনিককে দাবি করেছিলেন, একটি চক্র তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। ভিত্তিহীন চিঠি দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। তিনি সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন দাবি করে অতীতে টিউশনি করেও জীবনযাপন করার কথা ওই প্রতিবেদনে বলেছেন।

বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অবসরে যাওয়ার পর মনি লাল দাশের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।

জাতীয় স্বার্থ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি