চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের হাটহাজারী সদর বিটে সামাজিক বনায়নের দুটি বাগানের ১২টি লট নিলামে বিক্রির প্রায় তিন বছর পরও প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় তৎকালীন হাটহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামের দায়িত্বকাল নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে নিলাম-পরবর্তী অর্থ আদায়, গাছ কর্তন ও পরিবহন, সরকারি রাজস্ব জমা এবং উপকারভোগীদের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধের হিসাব।
বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক বনায়নের দ্বিতীয় আবর্তের আওতায় ২০১১-১২ অর্থবছরে হাটহাজারী সদর বিটে ২০ হেক্টর ও ৩৩ হেক্টর আয়তনের দুটি বাগান প্রতিষ্ঠা করা হয়।
২০২২-২৩ অর্থবছরে বাগান দুটির পরিপক্ক গাছ ১২টি লটে নিলামে বিক্রি করা হয়। এর মধ্যে ২০ হেক্টরের বাগানের লটগুলোর বিক্রয়মূল্য প্রায় ৭৫ লাখ টাকা এবং ৩৩ হেক্টরের বাগানের বিক্রয়মূল্য প্রায় ১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। দুই বাগান মিলিয়ে মোট অর্থ প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ টাকা।
অভিযোগ হলো, নিলাম সম্পন্ন হওয়ার পর গাছ কেটে সরিয়ে নেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় এসব অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি। অথচ বন বিভাগের বিধি অনুযায়ী সরকারি রাজস্ব আদায়, ট্রেজারি চালান, গাছ কর্তন ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপের যথাযথ নথি থাকার কথা।
এত বড় অঙ্কের অর্থের হিসাব নিষ্পত্তি না হওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠেছে-নিলাম থেকে গাছ কর্তন ও লট হস্তান্তর পর্যন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন হলো কীভাবে, আর বিক্রয়লব্ধ অর্থের হিসাবই বা গেল কোথায়?
হাটহাজারী রেঞ্জে নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর ডেপুটি রেঞ্জার মো. আইয়ুব আলী বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বরাবর লিখিত আবেদন করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সেখানে সাবেক রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামের দায়িত্বকালে সামাজিক বনায়নের ১২টি লটের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
আইয়ুব আলীর দায়িত্ব গ্রহণের পর মাঠপর্যায়ে গিয়ে দুটি বাগানের অবস্থা পরিদর্শন করেও তিনি গাছ না থাকার বিষয়টি দেখতে পান বলে সূত্রের দাবি। কিন্তু একই সঙ্গে নিলাম-পরবর্তী রাজস্ব জমার পূর্ণাঙ্গ হিসাব বা প্রয়োজনীয় ব্যাংক চালানের নথি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
এ পর্যায়ে বিষয়টি আর কেবল নিলাম-পরবর্তী হিসাবের অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গাছ কর্তন, পরিবহন, লট হস্তান্তর এবং অর্থ জমার পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই তদন্তের দাবি উঠেছে।
অভিযোগের মধ্যে চলতি বছরের ১৩ আগস্ট কয়েকটি চালানের মাধ্যমে মোট ১৩ লাখ ৬৭ হাজার ৮৫০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু ১২টি লটের কথিত প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ টাকা বিক্রয়মূল্যের বিপরীতে এই জমার অঙ্ক অত্যন্ত কম হওয়ায় নতুন করে হিসাবের প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সাইফুল ইসলামের কাছ থেকে পাওয়া চালানের কপি নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের অভিযোগ, ২০২২-২৩ অর্থবছরের সংশ্লিষ্ট নথিতে তৎকালীন দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকা শহর রেঞ্জ কর্মকর্তার সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহারের বিষয়টি দেখা গেছে।
এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে মূল চালান, কোষাগার হিসাব, ব্যাংক রেকর্ড এবং নিলামসংক্রান্ত দাপ্তরিক নথি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নিলামের নথি নিয়েও ধোঁয়াশা
অভিযোগের আরেকটি গুরুতর দিক হলো-১২টি লটের নিলামসংক্রান্ত মূল দরপত্র, কার্যাদেশ, লটভিত্তিক বিক্রয়মূল্য এবং অর্থ জমার পূর্ণাঙ্গ নথি নিয়ে অস্পষ্টতা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রয়োজনীয় কিছু মূল নথি এখন আর দপ্তরে পাওয়া যাচ্ছে না।
যদি নথি সত্যিই অনুপস্থিত থাকে, তাহলে নিলাম প্রক্রিয়ায় কারা অংশ নিয়েছিল, কোন লট কত টাকায় বিক্রি হয়েছে, কারা গাছ কাটার অনুমতি পেয়েছে, কত ঘনফুট কাঠ সরানো হয়েছে এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থের কত অংশ সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে-এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে মূল নথি উদ্ধার ও নথিভিত্তিক তদন্ত জরুরি।
সামাজিক বনায়নের অন্যতম উদ্দেশ্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে তাদের আর্থিকভাবে লাভবান করা। সংশ্লিষ্ট উপকারভোগীদের প্রাপ্য লভ্যাংশের ৪০ শতাংশ নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় উপকারভোগীদের অভিযোগ, গাছ বিক্রির অর্থের স্বচ্ছ হিসাব না থাকায় তারা তাদের প্রাপ্য অর্থ পেয়েছেন কি না, কত টাকা পাওয়ার কথা এবং কত টাকা বকেয়া রয়েছে-তার পরিষ্কার হিসাব তারা পাচ্ছেন না।
তাদের দাবি, দুটি বাগানের ১২টি লটের নিলাম বিজ্ঞপ্তি থেকে শুরু করে দরপত্র, কার্যাদেশ, নিলামমূল্য, গাছ কর্তন, পরিবহন, অর্থ আদায়, কোষাগারে জমা এবং উপকারভোগীদের মধ্যে লভ্যাংশ বিতরণ-প্রতিটি ধাপের নথি প্রকাশ করে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বন বিধিমালা অনুযায়ী সরকারি রাজস্ব জমার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে কাঠ কর্তন বা পরিবহনের সুযোগ থাকার কথা নয়। কিন্তু সাইফুল ইসলামের দায়িত্বকালে পছন্দের ঠিকাদারদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কাঠ কর্তন ও পরিবহনের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট লটগুলোর অনুমোদন, কর্তনকৃত কাঠের পরিমাণ, পরিবহন পাস, রাজস্ব চালান এবং নিলামমূল্যের সঙ্গে বাস্তবে সরিয়ে নেওয়া কাঠের পরিমাণ মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তদন্তের সময় বিট কর্মকর্তার মৃত্যুকে ঘিরেও অভিযোগ
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পাশাপাশি ৩১ আগস্টের একটি ঘটনাকে ঘিরে আরও গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। ওই দিন চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে তদন্ত দল হাটহাজারী সদর বিটে গেলে সেখানে কর্মরত বিট কর্মকর্তা লুৎফর রহমানকে নিয়ে ঘটনাটি ঘটে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
লুৎফর রহমান আগে থেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত দলের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে যাওয়ার সময় তাকে প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু পাহাড়ে উঠতে বাধ্য করা হয় এবং শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেই তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
তবে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ওই দিনের পরিস্থিতি নিয়ে অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে তদন্ত করে চিকিৎসা নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং ঘটনাস্থলের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
তদন্ত ঠেকাতে পাহাড়ে গোলাগুলির অভিযোগ
লুৎফর রহমানের মৃত্যুর পর তদন্তকারী দল ও বন কর্মকর্তাদের ভয় দেখিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে পাহাড়ে সশস্ত্র ব্যক্তিদের দিয়ে দফায় দফায় গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ঘটনাটি তদন্ত কার্যক্রমকে আতঙ্কিত ও বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে এই গোলাগুলির ঘটনা, অস্ত্রের ব্যবহার এবং এর সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এখনো তদন্তসাপেক্ষ।
দীর্ঘদিন একই সার্কেলে থাকার অভিযোগ
সাইফুল ইসলামকে ঘিরে আরও অভিযোগ রয়েছে, তিনি দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছর একই সার্কেলের বিভিন্ন দায়িত্বে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। এ সময়ের মধ্যে তার বিরুদ্ধে সরকারি রাজস্ব আত্মসাৎ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত অভিযোগও উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, জিআরএসে তার বিরুদ্ধে ২ কোটি ১৭ লাখ টাকা রাজস্ব আত্মসাৎ এবং প্রায় ২০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়টিও যাচাই করা হোক।
সামাজিক বনায়নের প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ টাকা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন, নথির অনুপস্থিতি এবং পরবর্তীতে মাত্র ১৩ লাখ ৬৭ হাজার ৮৫০ টাকা জমার তথ্য-সবকিছু মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক ও প্রশাসনিক তদন্তের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে তৎকালীন হাটহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তা, বর্তমানে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সদর রেঞ্জের দায়িত্বে থাকা মো. সাইফুল ইসলামের অফিসিয়াল মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে কিছু প্রশ্ন রেখে বার্তা পাঠালে তিনি সেখানে উল্লেখ করেন, অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন, মনগড়া ও বানোয়াট। একটি স্বার্থন্বেষী মহল আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করা ও মান-সম্মান হানির নিমিত্তে মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও মনগড়া তথ্য গণমাধ্যমকে দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, যদি কেহ প্রমান দিতে পারে আমি সরকারের একটি টাকাও রাজস্ব আত্মসাৎ করেছি তাহলে আমি স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দিব।
অবশ্য এর আগেও অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তিনি কয়েকটি চালানের কপি দেন। তবে সংশ্লিষ্ট কার্যাদেশ, নিলাম বিজ্ঞপ্তি, লটভিত্তিক নিলামমূল্য এবং নিলাম-পরবর্তী অর্থ জমার পূর্ণাঙ্গ নথি তিনি উপস্থাপন করতে পারেননি বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে অভিযোগ ও প্রতিবেদনে উল্লেখিত ঘটনার বিষয়ে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো-এর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ব্যর্থ হয় প্রতিবেদক। তাদের হোয়াটসঅ্যাপেও বার্তা পাঠালে তারা বক্তব্য দেননি। তাদেরও বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
হাটহাজারী সদর বিটের দুটি সামাজিক বনায়নের ১২টি লটের নিলামকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি এখন নির্ভর করছে নথি, ব্যাংক হিসাব, ট্রেজারি চালান, নিলাম রেজিস্টার, কার্যাদেশ, পরিবহনসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং উপকারভোগীদের হিসাব মিলিয়ে দেখার ওপর।
স্থানীয়দের দাবি, গায়েব হয়ে যাওয়া নথি উদ্ধার, সরকারি রাজস্বের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ, উপকারভোগীদের প্রাপ্য অর্থ নির্ধারণ এবং বিট কর্মকর্তা লুৎফর রহমানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তে একটি নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করা হোক। একই সঙ্গে গোলাগুলির অভিযোগেরও আইনগত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি বনাঞ্চলের সম্পদ ও সামাজিক বনায়নের অর্থ নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো দাপ্তরিক হিসাবের বিষয় ছাড়াও সরকারি রাজস্ব, বনসম্পদ, স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা-সবকিছুর প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।
তাই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


