সিডিএ’র সেই অদম্য প্রকৌশলী হামিদুলের ২২ মামলার গল্প! প্রশ্ন-তাকে রুখবে কে?

দুর্নীতির সাগরে নোঙর-শূন্য কাজের পূর্ণ বিল

প্রকাশিত: ১২ আগস্ট, ২০২৬ ১৫:২১

নথি বলছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর নজরে ছিল। স্বরাষ্ট্র ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গড়িয়েছে ফাইল।

তৎকালীন কালুরঘাট রোড উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে এক ইঞ্চি কাজ না করেই কোটি টাকার জালিয়াতি আর ভুয়া মেজারমেন্ট বুক (এমবি) বানানোর অপরাধে দায়ের হয়েছিল ২২টি ফৌজদারি মামলা।

কিন্তু চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নথিপত্রের এই কঠোর বাস্তবতা থেমে গেছে এক অদৃশ্য দেয়ালে এসে।

শত অনিয়ম, বিভাগীয় মামলা আর দুদকের চার্জশিটকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এখনো স্বপদে দাপটের সঙ্গে বহাল আছেন উপসহকারী প্রকৌশলী মুহাম্মদ হামিদুল হক।

সিডিএর অভ্যন্তরীণ সংস্থাপন শাখার নথিতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা বিচারাধীন। অথচ চেয়ার হারানোর ভয় তো দূরের কথা, সিডিএর প্রশাসনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ টেবিলে বসে এখনো কলম চালাচ্ছেন তিনি।

শুধু হামিদুল হকই নন, সিডিএর একঝাঁক বিতর্কিত প্রকৌশলী আইনি ফাঁকফোকর আর উচ্চ আদালতের ‘স্থগিতাদেশ’ (স্টে অর্ডার)-কে ঢাল বানিয়ে বছরের পর বছর সংস্থাটিকে কার্যত জিম্মি করে রেখেছেন। ধারাবাহিক সিরিজে এক এক করে প্রত্যেকের মুখোশ উন্মোচনে মাঠে কাজ করছে অনুসন্ধানী টিম।

কাজ না করেই বিল: সেই ২২ মামলার ভূত
সিডিএর ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ও চাঞ্চল্যকর দুর্নীতি হিসেবে চিহ্নিত ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের কালুরঘাট রোড সম্প্রসারণ প্রকল্প।

নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৬ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে ২০০৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পের লট নম্বর ১০, ১৩, ১৫ এবং ৩০-এ বিন্দুমাত্র ভৌত কাজ না করেই মেজারমেন্ট বুকে ভুয়া হিসাব দেখিয়ে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৯৪ টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

এই নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনায় ২০১০ সালের ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মহানগরীর চান্দগাঁও থানায় পৃথক ২২টি মামলা দায়ের করে দুদক।

এর মধ্যে এ সি সি জি আর ৩১/২০১০ এবং এ সি সি জি আর ২৮/২০১০ নম্বর মামলা দুটি সিডিএর ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়।

এই মামলাগুলোতে সিডিএর তৎকালীন ৭ জন প্রকৌশলীসহ মোট ৩৭ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয় তদন্তকারী সংস্থা।

কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতেই দেখা দেয় চরম স্থবিরতা। আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং আসামিদের একের পর এক স্থগিতাদেশ নেওয়ার সুযোগে মামলাগুলোর স্বাভাবিক গতি থমকে যায়।

তদন্ত থামানোর ‘কৌশল’ ও পদোন্নতির মহোৎসব

অভিযোগ রয়েছে, নিজ পদে বহাল থেকে উপ সহকারী প্রকৌশলী মুহাম্মদ হামিদুল হক শুধু বিভাগীয় তদন্তই প্রভাবিত করছেন না, বরং সংস্থার ভেতরের নথিপত্র গায়েব ও সাক্ষী ধ্বংসের পেছনেও কলকাঠি নাড়ছেন। তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যা সিডিএর সার্বিক জবাবদিহিতা ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়েছে।

অবশ্য সিডিএতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবারই প্রথম নয়। এই ২২ মামলার প্রধান চার্জশিটভুক্ত আসামি তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ কাঁধে নিয়েও পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলীর মতো শীর্ষ পদে আসীন হয়েছিলেন।

সেই একই পথ ধরে মুহাম্মদ হামিদুল হকসহ অন্য অভিযুক্তরা এখনো সংস্থার নীতিনির্ধারণী জায়গায় প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছেন।

কর্তৃপক্ষের মৌনতা ও ক্ষোভ
একজন কর্মকর্তা কীভাবে দুদকের মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং বিভাগীয় মামলার তথ্য চেপে রেখে বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করে যান-তা নিয়ে ক্ষোভ ফুসে উঠছে সিডিএর ভেতরেই।

সুশীল সমাজ ও নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকৌশলীরা আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এনেছেন ঠিকই, কিন্তু প্রশাসনিকভাবে তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে না রাখা সিডিএর তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের চরম ব্যর্থতা বা অনৈতিক সমঝোতারই ইঙ্গিত দেয়।

উচ্চ আদালতের আইনি ঢাল ব্যবহার করে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা পার পাওয়ার চেষ্টা করলেও সাধারণ নাগরিক ও সচেতন মহল এখন দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছেন।

অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) উপসহকারী প্রকৌশলী মুহাম্মদ হামিদুল হকের মুঠোফোনে কয়েকবার যোগাযোগ করেও কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুধে বার্তা পাঠালে তিনি নিজেই ফোন করেন। তবে অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি নন।

এদিকে চট্টগ্রাম নগরবাসী ও সিডিএর সৎ কর্মকর্তাদের স্পষ্ট দাবি-অবিলম্বে তদন্ত কাজ নিরপেক্ষ করতে উপসহকারী প্রকৌশলী মুহাম্মদ হামিদুল হকসহ অভিযুক্ত প্রকৌশলীদের দায়িত্ব থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। অন্যথায় সিডিএর উপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা চিরতরে হারিয়ে যাবে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি