বাহ্যিক চাকচিক্য, চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা আর আধুনিক ডেকোরেশন-এর আড়ালেই কি লুকিয়ে ছিল অস্বাস্থ্যকর ও বিষাক্ত খাবারের পসরা?
নামিদামি ব্র্যান্ডের রেস্তোরাঁয় গিয়ে পছন্দের খাবার অর্ডার করার আগে এখন হয়তো একাধিকবার ভাবতে হবে খাদ্যরসিকদের।
চট্টগ্রাম নগরে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এক অভিযানে বেরিয়ে এসেছে অভিজাত রেস্তোরাঁ ও ব্র্যান্ড শপগুলোর অনিয়ম ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের ভয়াবহ চিত্র।
পচা আলু, রক্তমাখা পচা মাংস, কৃত্রিম ও ক্ষতিকর অননুমোদিত রং, মেয়াদোত্তীর্ণ সস আর তেলাপোকা ঘুরে বেড়ানো পরিবেশে তৈরি হচ্ছিল নামীদামি প্রতিষ্ঠানের ‘খাবার’!
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন স্থানে চালানো এক অভিযানে ১৯টি খাদ্য প্রতিষ্ঠানকে মোট ৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত।
আদালতের বিচারক মোহাম্মদ মোস্তফার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে মারাত্মক অপরাধের দায়ে চাক্তাইয়ের এক মশলা মিলের মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা এবং একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
অভিযানে কোন প্রতিষ্ঠানে কী মিলল:
হাইওয়ে সুইটস অ্যান্ড বেকারি (লালখান বাজার): চকচকে বাক্সে ভরা মিষ্টি ও স্ন্যাক্সের নেপথ্যে ছিল মানহীন ঘি ও নিয়ন্ত্রণহীন টোস্ট-বিস্কুট।
অপরিষ্কার ও স্যাঁতসেঁতে মেঝে, অপরিচ্ছন্ন ছানার পাত্র আর ময়দার চারপাশে মিলল তেলাপোকার অবাধ বিচরণ! প্রতিষ্ঠানটিকে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর ২৬ ধারায় জরিমানা করা হয় ৩ লাখ টাকা।
জসিম মশলা মিল (চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ): কাঠের গুঁড়া মেশানো হতো মরিচ-হলুদে! ব্যবহার করা হতো অননুমোদিত ক্ষতিকর রং এবং পচা-নোংরা মরিচ।
সরকারি কাজে বাধা ও ভেজাল মশলা তৈরির দায়ে মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে সরাসরি বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়েরের পাশাপাশি একজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
বালি আর্কেড ফুড কোর্ট (চকবাজার):
শহরের তরুণ-তরুণীদের আড্ডার অন্যতম প্রিয় স্থান চকবাজারের বালি আর্কেড এর ফুড কোর্ট। কিন্তু সেখানকার একাধিক প্রতিষ্ঠানে ছিল অনিয়মের ছড়াছড়ি।
কেএফসি (KFC): বিশ্বখ্যাত ব্রান্ড হলেও বালি আর্কেড শাখায় পাওয়া গেল পচা আলু ও পচা মজেস দিয়ে খাবার তৈরির প্রমাণ! অভিযানে নামিদামি এ প্রতিষ্ঠানকে গুণতে হল ৫০ হাজার টাকা জরিমানা।
ফুচকা খাদক: পচা আলু ও পচা আম ব্যবহার করে খাবার পরিবেশনের অপরাধে গুণতে হলো ৩০ হাজার টাকা জরিমানা।
স্ট্রিট ইটস: পোড়া তেলের ব্যবহার, খাবারে খামির ময়লা, কাঁচা ও রান্না খাবার এক ফ্রিজে রাখা এবং খবরের কাগজে খাবার পরিবেশন করায় জরিমানা করা হয় ৩০ হাজার টাকা।
গ্রিল মাস্টার অ্যান্ড পাপাচিনো: ফ্রিজে পচা গাজর, পেঁয়াজ, মেয়াদোত্তীর্ণ চীনা সবজি, পচা সস ও খোলা মাশরুম। এমনকি প্লাস্টিকের বক্সে গরম খাবার রাখার অপরাধে জরিমানা: ৫০ হাজার টাকা।
লাজজাত: মিলল মেয়াদোত্তীর্ণ মুরগির মাংস, ব্রেডক্রাম্ব, নিম্নমানের সস ও ক্ষতিকর রংমিশ্রিত মরিচ। এ প্রতিষ্ঠানকে গুণতে হল ৫০ হাজার টাকা জরিমানা।
দিল্লি দরবার অ্যান্ড সালাদ লাভার্স: নোংরা পাত্রে রান্না, কাঁচা ও রান্না মাংস একসাথে জমা রাখা, অপরিষ্কার ডিম ও পচা আলু সিদ্ধ করার প্রমাণ মিলল। এ প্রতিষ্ঠানকে গুণতে হল এক লাখ টাকা জরিমানা।
চিলিস & এলিগ্যান্ট: চিলিস-কে নোংরা পরিবেশে কাঁচা-রান্না খাবার একসাথে রাখায় ৩০ হাজার টাকা এবং এলিগ্যান্ট-কে পচা গন্ধযুক্ত মাংস ও নষ্ট মাশরুম ব্যবহারের দায়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
হটডগ অ্যান্ড কোম্পানি: সস্তা দামের পাঙাশ মাছকে ‘ডরি ফিশ’ বলে বিক্রি করে প্রতারণা এবং রক্তমাখা মাংস সংরক্ষণে গুণতে হলো ৫০ হাজার টাকা জরিমানা।
এছাড়াও রক্তমাখা মুরগির হাড়-মাংস ও অনিয়মের দায়ে দ্য বোন চাইনা (২৫ হাজার), ৯ ক্যান্ডেল ২.০ (২৫ হাজার), দ্য চিকেন বক্স (২৫ হাজার), ফুচকাওয়ালা অ্যান্ড জুসবার (৫০ হাজার), দ্য মাঞ্চগাই (৩০ হাজার), ওয়াফেল কিং (১০ হাজার), দ্য ওয়াফেল (১০ হাজার) এবং টমিয়াম-কে (১০ হাজার টাকা) জরিমানা করা হয়।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চট্টগ্রামের জেলা ও মহানগর কার্যালয়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিদর্শক, আরএসআরবি-৭, সিএমপি এবং ব্যাটালিয়ন আনসারের সমন্বিত এই অভিযানে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে-জনস্বাস্থ্যের তোয়াক্কা না করে যারাই গ্রাহকদের সাথে প্রতারণা করবে, আইনের হাত থেকে রেহাই পাবে না কেউ।
সাধারণ মানুষের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নগরজুড়ে এই চিরুনি অভিযান ও সংক্ষিপ্ত বিচারিক কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


