আদালতের রায় আছে, দীর্ঘদিনের ভোগদখল রয়েছে, এমনকি ছিল মাথার ওপর এক চিলতে ছাদও। কিন্তু যা ছিল না, তা হলো জোর-জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর পেশিশক্তি।
আর এই ‘অপরাধেই’ জীবনের শেষ আশ্রয়টুকুও ছাই হয়ে গেল ৬৮ বছর বয়সী এক অসহায় বিধবার।
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ৯ নম্বর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মিঠাছড়া এলাকার ‘দুলালের বাড়ি’।
২০১৫ সালে স্বামী অমরন্দু দাশ রায় ওরফে দুলাল মারা যাওয়ার পর তিন কন্যাকে নিয়ে এই ভিটাতেই বুক বেঁধে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন প্রনতি রানী দাশ রায়।
কিন্তু প্রতিবেশীদের দৃষ্টি পড়েছিল তার স্বামীর রেখে যাওয়া তফসিলভুক্ত ভিটেমাটির ওপর। অভিযোগ, দীর্ঘদিনের সম্পত্তির বিরোধে সেই বসতঘরটিই শুক্রবার গভীর রাতে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে।
থানায় লিখিত অভিযোগ, কিন্তু মেলেনি পুলিশের দেখা
প্রনতি রানীর স্বজনদের অভিযোগ, ঘর পোড়ানোর ঘটনাটি হুট করে ঘটেনি, বরং এটি ছিল এক পরিকল্পিত ছকের চূড়ান্ত পরিণতি। এর আগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রনতি রানী মিরসরাই থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন।
অভিযোগে স্পষ্ট নাম উল্লেখ করা হয়েছিল প্রতিবেশী চোটন কর্মকার (৩৭), মো. সোহেল, আজিম উদ্দিন ও আজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ ছিল, তারা দলবদ্ধ হয়ে জোরপূর্বক প্রনতি রানীর লাগানো গাছপালা কেটে নিয়ে গেছে।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর আট দিন পার হয়ে গেলেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করেনি পুলিশ।
ভুক্তভোগী পরিবারের আকুতি পৌঁছায়নি প্রশাসনের কান পর্যন্ত।
আমাদের উদ্দেশ্য করেই নিঃস্ব করা হচ্ছে
ফাঁকা ভিটার সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রনতি রানী দাশ বলেন, আমার স্বামী মারা গেছেন ২০১৫ সালে। তিন মেয়েকে নিয়ে এত বছর ধরে স্বামীর ভিটায় বসবাস করছি। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ বারবার সালিশ-মিমাংসা হলেও তারা কিছুই মানে না।
আদালত রায় দিয়েছে, কিন্তু তারা গায়ের জোরে সব অমান্য করে। গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার বিচার চেয়ে থানায় অভিযোগ দিয়েছি, প্রতিকার পাইনি।
এখন রাতের আঁধারে আমার ঘরটাই পুড়িয়ে দেওয়া হলো। দুটি ঘটনা একই চক্র ঘটিয়েছে। ওদের মূল উদ্দেশ্য আমাকে উচ্ছেদ করে জমি দখল করা।
ঘটনাটির স্থানীয় সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন মিরসরাই উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব গাজী নিজাম উদ্দীন।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) উভয় পক্ষকে নিয়ে এক সামাজিক বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রনতি রানী সেই বৈঠকে উপস্থিত হলেও হাজির হননি অভিযুক্ত পক্ষ।
এ বিষয়ে গাজী নিজাম উদ্দীন জানান, প্রনতি রানী ও চোটন কর্মকারের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধটি দীর্ঘদিনের। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও অনেক দেনদরবার হয়েছিল, কিন্তু সুরহা হয়নি।
এবার উভয় পক্ষ ও আমার সমন্বয়ে নিরপেক্ষ প্রতিনিধি দিয়ে দলিল-কাগজপত্র পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু প্রনতি রানী বৈঠকে আসলেও চোটন কর্মকার আসেননি। এর মধ্যেই প্রনতি রানীর ঘর পোড়ানোর দুঃখজনক ঘটনাটি ঘটে। আমি তাকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।
অবশ্য বৈঠকে অনুপস্থিতি ও মূল বিরোধের বিষয়ে নিজের দায় অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত চোটন কর্মকার। তার দাবি, আজকের বৈঠক সম্পর্কে আমি জানতাম না। মূল সম্পত্তির বিরোধ হচ্ছে সুমনের সঙ্গে প্রনতি রানীর।
সুমনের সঙ্গে আমার সুসম্পর্কের কারণে শুধু সমাধানের জন্য আমি সম্পৃক্ত হয়েছিলাম। এখন আমাকে অযথা বিবাদী করে অভিযুক্ত করা হচ্ছে।
এদিকে মিরসরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদা ইয়াসমিন গণশাধ্যমকে জানান, ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ পাননি।
আর ১৪ সেপ্টেম্বরের গাছ কাটার অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক মন্তব্য না করে তিনি বলেন, আমি বর্তমানে চট্টগ্রামে একটি মিটিংয়ে আছি। দ্রুত ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে তদন্ত নিশ্চিত করা হবে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইনের রায় আর প্রশাসনের দরজায় কড়া নেড়েও রক্ষা পাননি অসহায় এই বিধবা।
রাতের আঁধারে চোখ মেলতেই সামনে শুধুই ধোঁয়া আর ছাইয়ের স্তূপ-এখন তিন মেয়েকে নিয়ে কোথায় দাঁড়াবেন ৬৮ বছরের প্রনতি রানী দাশ, সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই কারও কাছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


