নকশা ছিল কাগজে, ভবন উঠেছে নিয়মের বাইরে-অতঃপর…

প্রকাশিত: ০২ জুলাই, ২০২৬ ২১:০৮

সকালের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। বাকলিয়ার কল্পলোক আবাসিক এলাকার সরু সড়কে একে একে ঢুকতে শুরু করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) গাড়িবহর।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বিকট শব্দে চলতে থাকে হাতুড়ি, কাটার মেশিন ও ভাঙার যন্ত্র। কয়েক মিনিট আগেও যে বহুতল ভবনগুলোর দেয়াল, বারান্দা কিংবা বাড়তি অংশ দাঁড়িয়ে ছিল দৃঢ়ভাবে, সেগুলো ধীরে ধীরে ভেঙে মাটিতে গড়িয়ে পড়তে থাকে।

বিস্মিত চোখে কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছেন, কেউ আবার নীরবে দেখছেন বছরের পর বছর ধরে চোখের সামনে গড়ে ওঠা ‘অবৈধ’ নির্মাণের পরিণতি।

ভবনের মালিকদের মুখে উদ্বেগ, শ্রমিকদের চোখে অনিশ্চয়তা, আর প্রশাসনের কণ্ঠে কঠোর বার্তা—‘নকশাবহির্ভূত নির্মাণ আর চলবে না।’

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত অভিযানে কয়েকটি ভবনের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে নগর পরিকল্পনার দীর্ঘদিনের সংকট, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের এক নির্মম বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে।

কারণ, যেসব ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে দেওয়া হলো বা সিলগালা করা হলো, সেগুলো তো একদিনে তৈরি হয়নি।

মাসের পর মাস, কোথাও কোথাও বছরের পর বছর নির্মাণ চলেছে। প্রশ্ন তাই একটাই—নিয়ম ভাঙা যখন চলছিল, তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি কোথায় ছিল?

চউকের ভাষ্য, নগরের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ভবন মালিকই অনুমোদিত নকশা এবং বিল্ডিং কোড পুরোপুরি অনুসরণ করেন না। ভবন নির্মাণের সময় বাধ্যতামূলক সেটব্যাক রাখা হয় না, পাশের ভবনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় খালি জায়গা রাখা হয় না, সড়ক কিংবা নালার নির্ধারিত দূরত্ব মানা হয় না।

কোথাও আবার অনুমোদনের চেয়ে বেশি তলা নির্মাণ করা হয়েছে। একাধিকবার সতর্ক করার পরও অনেক মালিক আইন মানেননি বলেই দাবি সংস্থাটির।

কিন্তু ভবন মালিকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজের প্রতিটি ধাপে নজরদারির দায়িত্ব ছিল চউকেরই। সময়মতো পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হলে অনেক অনিয়ম শুরুতেই থামানো যেত।

দীর্ঘদিন তদারকির ঘাটতির সুযোগেই অনেকে নকশাবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণ করেছেন বলে দাবি তাদের।

ফলে অভিযানের দিন ভাঙা পড়া ইট-সিমেন্টের স্তূপের আড়ালে উঠে আসে আরেকটি বড় প্রশ্ন—দায় শুধু ভবন মালিকদের, নাকি নিয়ন্ত্রক সংস্থারও?

কল্পলোক থেকে শুরু :
দিনের প্রথম অভিযান পরিচালিত হয় বাকলিয়া থানার কল্পলোক আবাসিক এলাকায়। কয়েকটি নির্মাণাধীন ভবন ঘুরে দেখেন চউকের কর্মকর্তারা।

পরিদর্শনে দেখা যায়, একাধিক ভবনে বাধ্যতামূলক সেটব্যাক রাখা হয়নি। অনুমোদিত নকশা থেকে বিচ্যুতি ঘটানো হয়েছে।

কোথাও ভবনের চারপাশের খালি জায়গা দখল করা হয়েছে, কোথাও নির্মাণবিধি পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।

অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ায় চার ভবনের মালিককে মোট ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে একটি ভবন সিলগালা করা হয়।

অভিযানের সময় কল্পলোক আবাসিক এলাকার ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা কয়েকটি দোকান মালিকদের নিজ উদ্যোগেই সরিয়ে নিতে দেখা যায়।

তবে অভিযানের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল অবৈধভাবে সম্প্রসারিত ভবনের অংশ ভেঙে ফেলা। অন্তত ছয়টি বহুতল ভবনের নকশাবহির্ভূত অংশ অপসারণ করা হয়।

একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভবনগুলোর বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়, যাতে আইন অমান্য করে নির্মাণকাজ আর এগোতে না পারে।

পরে নগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান:
কল্পলোকের পর অভিযান চলে কে বি আমান আলী রোড এলাকায়। সেখানে একটি ভবন সড়ক দখল করে এবং প্রয়োজনীয় সেটব্যাক না রেখে নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ভবন মালিককে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

একই দিনে মোহরা এলাকায় পরিচালিত অভিযানে অনুমোদিত নকশা ছাড়া নির্মাণের অভিযোগে একটি ভবন সিলগালা করা হয়।

পাশাপাশি নকশাবহির্ভূত নির্মাণের দায়ে দুই ভবনের মালিককে মোট ছয় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

অভিযানের শেষ ভাগে কাপ্তাই রাস্তার মাথায় অবস্থিত ক্যাফে আল মক্কা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট ভবনে গিয়ে চউকের কর্মকর্তারা দেখতে পান, ভবনটি অনুমোদিত নকশা ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে ভবনটি সিলগালা করা হয়।

একই অভিযানে ১৪ তলা কাজী টুইন টাওয়ার ভবনের মালিকপক্ষ অনুমোদিত নকশা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়। ফলে ভবনটিও সিলগালা করে দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত।

দিনশেষে চউকের হিসাব বলছে, মোট ১৫টি ভবন পরিদর্শন, সাত ভবনের মালিককে ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, চারটি ভবন সিলগালা এবং অন্তত ছয়টি ভবনের অবৈধ অংশ অপসারণ করা হয়েছে।

কঠোর বার্তা দিল চউক:
অভিযান শেষে চউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পরিকল্পিত, নিরাপদ ও নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে।

নগরের কোথাও নকশাবহির্ভূত কিংবা অবৈধ ভবন নির্মাণ কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।

তিনি ভবন মালিকদের উদ্দেশে বলেন, যারা অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ করেছেন, তারা স্বেচ্ছায় অবৈধ অংশ অপসারণ করুন।

অন্যথায় আইন অনুযায়ী চউক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতেও আরও জোরালোভাবে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

অভিযানে চউকের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হামীমুন তানজীন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর ১২(১) ধারা অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

অভিযানে নেতৃত্ব দেন চউকের অথরাইজড অফিসার-২ কাজী কাদের নেওয়াজ

এ সময় সহকারী অথরাইজড অফিসার আসাদ বিন আনোয়ার, ফারুক আহাম্মদ এবং সংশ্লিষ্ট ইমারত পরিদর্শকেরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রশ্নটি থেকে যায়…
২ জুলাইয়ের এই অভিযান চট্টগ্রামজুড়ে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করলে আর ছাড় নয়। কিন্তু একই সঙ্গে এই অভিযানের ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে উঠে এসেছে আরও বড় একটি প্রশ্ন।

যে ভবনের বাড়তি তলা আজ ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, সেটি তো একদিনে তৈরি হয়নি। যে ভবনের চারপাশে খালি জায়গা রাখা হয়নি, সেটিও কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছরে নির্মিত হয়েছে।

যে ভবন অনুমোদন ছাড়াই দাঁড়িয়ে গেছে, তার প্রতিটি তলায় ইট, বালু, রড ও কংক্রিট উঠেছে প্রকাশ্যেই।

তাহলে নির্মাণের প্রতিটি ধাপে কোথায় ছিল নজরদারি? কেন অনিয়ম শুরুর সময়ই তা থামানো গেল না? আর যদি নিয়মিত তদারকি থাকত, তাহলে কি আজ এই ভাঙচুর, জরিমানা আর সিলগালার প্রয়োজন হতো?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই চট্টগ্রামে অবৈধ ভবন নির্মাণের গত এক দশকের ইতিহাস, প্রশাসনিক তদারকির বাস্তবতা এবং আইনের প্রয়োগের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি