চট্টগ্রামে স্বাস্থ্য খাতে অনিয়মের পাহাড় গড়ে বদলি,জাহাঙ্গীর আলম ওএসডি

পরীক্ষায় ১৭১ পদ, কোটি টাকার 'গোপন লেনদেন

প্রকাশিত: ২০ আগস্ট, ২০২৬ ১৪:০৭

চট্টগ্রামে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্বাস্থ্য প্রশাসনের শীর্ষ পদে বসেই একের পর এক বিতর্ক, অনিয়ম ও অনৈতিক সুবিধার অভয়ারণ্য গড়ে তোলার অভিযোগে অবশেষে খেসারত দিতে হলো বিতর্কিত সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে।

অনিয়মের পাহাড় জমিয়ে কার্যালয়কে কার্যত ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির আখড়ায় পরিণত করার পর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের (পার-২ শাখা) এক আদেশে তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বদলি করা হয়েছে।

যুগ্মসচিব সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এই আদেশে জনস্বার্থের কথা উল্লেখ করা হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নিয়োগ কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতি চরমে পৌঁছানোতেই এ পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২৪ আগস্টের মধ্যে নতুন পদে যোগ না দিলে ২৫ আগস্ট থেকে তিনি সরাসরি স্ট্যান্ড রিলিজ হিসেবে গণ্য হবেন।

বিতর্কিত এই কর্মকর্তার জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন কুমিল্লার বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান।

ডা. জাহাঙ্গীর আলমের দায়িত্ব পালনকালীন সবচেয়ে বড় অসংগতি প্রকাশ পায় সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অধীনে স্বাস্থ্য সহকারীসহ ১৭১টি শূন্য পদের নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে।

হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এমন দৃশ্য নিকট অতীতে দেখা যায়নি। পরীক্ষার একদম শেষ মুহূর্তে হাজার হাজার পরীক্ষার্থীকে এসএমএস না পাঠানো, ওএমআর শিট বিতরণে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং পরীক্ষা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অলৌকিকভাবে ফলাফল প্রকাশ-সব মিলিয়ে এক সাজানো নাটকের স্পষ্ট ছাপ ফুটে ওঠে।

প্রতিটি পদের বিপরীতে বিপুল অর্থ লেনদেনের বিষাক্ত গুঞ্জন এখন প্রশাসনিক করিডোরে ভাসছে।

শুধু নিয়োগ বাণিজ্যই নয়, সিভিল সার্জন কার্যালয়ে গড়ে উঠেছিল সিন্ডিকেট নির্ভর চাঁদাবাজির জাল। কার্যালয়েরই এক প্রভাবশালী কর্মচারীকে ঢাল বানিয়ে জাহাঙ্গীর আলমের নামে খোলাখুলি বকশিস ও অনৈতিক অর্থ আদায় করা হতো।

চাঞ্চল্যকর এই চাঁদাবাজি ফাঁস হয়ে গেলে আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো কার্যালয়ের ভেতরে প্রশাসনিক চাপে ভুক্তভোগীদের সাথে ‘আপস-মীমাংসা’র মাধ্যমে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এছাড়া চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নকে নিয়মমাফিক সেবার বদলে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের উৎসে পরিণত করা হয়েছিল।

বছরের পর বছর অবৈধভাবে চলা মানহীন ক্লিনিকগুলোকে মাসোহারার বিনিময়ে ছাড়পত্র দেওয়ার মারাত্মক অভিযোগও তার নথিভুক্ত রয়েছে।

প্রশাসনিক পদ থেকে তাকে ওএসডি করে সরিয়ে দেওয়াই কি শেষ পরিণতি, নাকি ১৭১টি পদের অনিয়ম ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের নথি গায়েব হওয়া কোটি টাকার বাণিজ্যের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে? এখন এটাই চট্টগ্রামবাসীর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যদি অবিলম্বে এই প্রশাসনিক নৈরাজ্যের গভীর তদন্ত শুরু না করে, তবে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার ওপর থেকে শেষ আস্থাটুকুও হারিয়ে যাবে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি