চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী উপকূলের বিষাক্ত বাতাস আর লোনা পানিতে মিশে আছে ৯টি তাজা প্রাণের শেষ দীর্ঘশ্বাস। ১৪ আগস্ট ‘এমটি রাসি’ নামের একটি এলএনজি ট্যাংকার কাটার সময় মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে ঢলে পড়েন ৯ জন শ্রমিক।
সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে নয় শ্রমিকের মৃত্যু কেবল কোনো সাধারণ শিল্প দুর্ঘটনা নয়, এটি পরিবেশ আইন-হাইকোর্টের নির্দেশনা এবং ন্যূনতম মানবিক নিরাপত্তাকে তোয়াক্কা না করে তৈরি করা এক সাজানো মরণফাঁদ।
বিপজ্জনক বর্জ্য ও জাহাজ ভাঙার বিধিমালার তোয়াক্কা না করে পরিচালিত এই ইয়ার্ডের অতীত ইতিহাস আরও আতঙ্কের।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নোটিশ অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই ফেরদৌস স্টিলেই অন্তত পাঁচবার একই ধরনের প্রাণঘাতী বিপর্যয় ঘটেছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা প্রশিক্ষণহীন, অদক্ষ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অনভিজ্ঞ এই শ্রমজীবীদের হাতে দেওয়া হয়নি প্রয়োজনীয় কোনো প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা সরঞ্জাম।
অবাক করার বিষয় হলো, দুর্ঘটনার প্রায় ছয় মাস আগেই সরকারি পরিদর্শনে ইয়ার্ডটির মারাত্মক নিরাপত্তা ঘাটতি, ঝুঁকি মূল্যায়নের অনুপস্থিতি এবং শ্রম আইন লঙ্ঘনের বিষাক্ত চিত্র ধরা পড়েছিল। তবুও নেওয়া হয়নি কার্যকর কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ।
৯ প্রাণের বিনিময়ে জরিমানা ৫ লাখ
হত্যাকাণ্ডসম এই বিপর্যয়ের পাঁচ দিন পর ঘুম ভেঙেছে পরিবেশ অধিদপ্তরের। গত ১৯ আগস্ট সংস্থাটির চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ে আয়োজিত শুনানিতে ইয়ার্ড প্রতিনিধি নিজের অপরাধ স্বীকার করার পর পরিবেশগত ক্ষতির দোহাই দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করা হয়েছে মাত্র ৫ লাখ টাকা!
পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক জমির উদ্দিনের সই করা আদেশে ফেরদৌস স্টিলের পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করে সাত কার্যদিবসের মধ্যে তা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে পরিবেশগত ছাড়পত্র নবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ইয়ার্ডে জাহাজ কাটার পুনরারম্ভ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সহকারী পরিচালক আশরাফ উদ্দিন জানান, নির্দেশ না মানলে সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলাসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়-যে ঘাটতি আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল, ৯ শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটার আগে সেখানকার নজরদারি কতটা কার্যকর ছিল? ৯টি তাজা প্রাণের বিনিময়ে ৫ লাখ টাকার এই জরিমানা কি আইন প্রয়োগের মহড়া, নাকি অপরাধীদের দায়মুক্তির এক সূক্ষ্ম কৌশল?
‘এমটি রাসি’ জাহাজটি কাটার জন্য ২০২৫ সালের জুলাইয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ৫২৯তম সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
ছাড়পত্র নবায়ন না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ট্যাংকার কাটার ধৃষ্টতা তারা পেল, তার সুনির্দিষ্ট জবাব মেলেনি।
পরিবেশবিদদের মতে, তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরের স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণেই প্রকৃত দোষীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে।
মালিক ও প্রধান কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
নয় শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় বেলা দুটি পৃথক আইনি ও আদালত অবমাননার নোটিশ দিয়েছে। সংগঠনটি ফেরদৌস স্টিলের স্বত্বাধিকারী ও প্রধান কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং পাসপোর্ট জব্দের জোর দাবি জানিয়েছে।
একই সঙ্গে শিল্প, পরিবেশ ও শ্রম মন্ত্রণালয়সহ ১২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দিয়ে আগামী তিন দিনের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপের তথ্য জানাতে বলা হয়েছে। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করা হবে।
বেলা তাদের নোটিশে উল্লেখ করেছে, পরিবেশ ও শ্রম সুরক্ষায় হাইকোর্ট একাধিক মামলায় ‘গ্যাস-ফ্রি’ সার্টিফিকেট নিশ্চিত করা, কালো তালিকাভুক্ত দেশ থেকে জাহাজ আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কিন্তু ‘এমটি রাসি’ জাহাজে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতিতে শ্রমিকের মৃত্যু প্রমাণ করে এই নির্দেশনাসমূহ সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে। বেলার মতে, জাহাজভাঙা শিল্প নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার প্রতিনিধিদের দিয়েই তদন্ত করানো হচ্ছে, যা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে।
তাই সংশ্লিষ্ট সংস্থার বাইরে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে নতুন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
নয়টি পরিবার ইতিমধ্যে তাদের উপার্জনক্ষম স্বজনকে হারিয়েছে। এই ট্র্যাজেডির প্রকৃত সত্য উন্মোচনে ‘এমটি রাসি’র আগমনী সনদ, গ্যাস-ফ্রি পরীক্ষা পদ্ধতি এবং পূর্বের সরকারি পরিদর্শন প্রতিবেদনের পুঙ্খানুপুঙ্খ পুনঃতদন্ত জরুরি।
রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো এই মৃত্যুকে কেবল ৫ লাখ টাকার জরিমানার আদেশে ধামাচাপা না দিয়ে, দায়ী ইয়ার্ড মালিকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা।

