৯৪ লাখ টাকার টেন্ডার কাগজে, বাস্তবে ‘মৃত্যুফাঁদ’ জঙ্গল পদুয়া সড়ক!

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬ ২০:৪৭

“অবাজি, এই পর্যন্ত ৩০ বারের বেশি ফিতা দিয়া সড়ক মাপল, কতবার যে ছবি তুলল! লোক আসে, ফিতা ধরে মেপে নিয়ে যায়-তারপর আর কোনো খবর থাকে না। কাজের কাজ তো কিছুই হইলো না!”

ক্ষোভ, হাহাকার আর তীব্র বিরক্তি নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের উত্তর পদুয়া সাদেক সিকদার পাড়ার বয়োবৃদ্ধ আবদুল খালেক।

বারবার মাপজোক আর লোকদেখানো পরিদর্শনের নামে স্থানীয়দের সাথে যা হচ্ছে, তাকে আর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বলতে রাজি নন এলাকার মানুষ-তাঁদের চোখে এটি এক প্রকার ‘তামাশা’।

উপজেলার ঠাকুরদিঘী থেকে জঙ্গল পদুয়া পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় দুই কিলোমিটারের সড়কটি এখন আর চলাচলের মাধ্যম নেই, স্থানীয় হাজার হাজার মানুষের জন্য রূপ নিয়েছে এক বিভীষিকাময় ‘মৃত্যুফাঁদে’।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বান্দরবান পার্বত্য জেলার যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটির প্রাচীন সলিং উঠে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিশালাকার গর্ত ও গভীর খাদ। সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যায় সেই ক্ষত রূপ নিয়েছে পূর্ণাঙ্গ জলাশয়ে। সামান্য বৃষ্টিতেই কাদা ও নোংরা পানির তলে হারিয়ে যায় সড়কটি।

সবচেয়ে ভয়াবহ ও মর্মান্তিক চিত্র তৈরি হয় স্বাস্থ্যঝুঁকির ক্ষেত্রে। সড়কের ঝাকুনি ও অমানুষিক ঝাঁকুনিতে সাধারণ মানুষ তো বটেই, সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ছেন গর্ভবতী নারী ও সংকটাপন্ন রোগীরা।

স্থানীয়দের বরাতে জানা গেছে, হাসপাতালে নেওয়ার পথে একাধিক অন্তঃসত্ত্বা নারী গাড়ির ভেতরেই সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হয়েছেন।

অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও সময়মতো চিকিৎসাকেন্দ্রে না পৌঁছাতে পেরে মা ও নবজাতকের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। এটি কেবল সড়ক সংকট নয়, সরাসরি এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য ও মানব অধিকারের বিপর্যয়।

শিক্ষার্থীদের জামায় কাদার দাগ, আতঙ্কে অভিভাবকেরা

উপজেলার হাজার হাজার মানুষ ও শত শত যানবাহনের দৈনন্দিন চলাচলের এই পথে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।

উত্তর পদুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী আক্ষেপ করে জানায়, বাড়ি থেকে পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে স্কুলে বের হলেও গর্তের নোংরা পানি ছিটকে জামাকাপড় নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় পিচ্ছিল খাদে পড়ে মারাত্মক আঘাতও পায় তারা।

উত্তর পদুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিক উদ্দীন পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, “সাম্প্রতিক বন্যায় সড়কের গর্তগুলো আরও প্রকট হয়েছে। সড়কটির এই নরককুণ্ড অবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা স্কুলে আসছে। দ্রুত এটি সংস্কার করা না হলে শিক্ষা কার্যক্রমেও এর বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”

টেন্ডার থেকে বাতিল: বিশ্বযুদ্ধের দোহাই ও ঠিকাদারের তালবাহানা

সড়কটির এই দুরবস্থার পেছনে উন্মোচিত হয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ঠিকাদারের চরম দায়িত্বহীনতা।

উপজেলা প্রকৌশলী অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সড়কটি সংস্কারের জন্য প্রাক্কলিত ৯৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

চলতি বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে টেন্ডার আহ্বান করা হলে ‘আবছার কনস্ট্রাকশন’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটির দায়িত্ব পায় এবং গেল বছরের ২ ডিসেম্বরে তাদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কখনো বহির্বিশ্বের যুদ্ধ ও মালামালের দাম বৃদ্ধি, আবার কখনো স্থানীয় নির্বাচনের অজুহাত দেখিয়ে কাজ ঝুলিয়ে রাখে। ঈদের পর কাজ শুরু করার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত অপারগতা প্রকাশ করে ঠিকাদার।

দীর্ঘ তালবাহানার পর বাধ্য হয়ে এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী চিঠি দিয়ে বিধি অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চুক্তি ও টেন্ডার বাতিল করেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আমানুল হক আমান মেম্বার বলেন, “এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকার মূল চালিকাশক্তি এই সড়ক। টেন্ডার হওয়ার পর আশা জেগেছিল, কিন্তু ঠিকাদারের অপরাগতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় আবার ভেস্তে গেল। নতুন করে দ্রুত কাজ শুরু না হলে জনগণের ক্ষোভ রাজপথে আছড়ে পড়বে।”

টেন্ডার বাতিলের পর সম্প্রতি আবারও ঠাকুরদিঘী-জঙ্গল পদুয়া সড়কের নতুন প্রাক্কলন তৈরির জন্য ফিতা ও ক্যামেরা হাতে পরিমাপ করতে যান উপজেলা প্রকৌশলী কাজি ফাহাদ বিন মাহমুদ। আর তাতেই নতুন করে ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয় অধিবাসীরা।

এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী ও গোলাম কিবরিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফিতা দিয়ে পরিমাপ আর ছবি তোলার এই দৃশ্য তারা ৩০ বারেরও বেশি দেখেছেন। কিন্তু তাদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ ও আতঙ্কের কোনো সমাধান হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে লোহাগাড়া উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী কাজি ফাহাদ বিন মাহমুদ বলেন, “বিগত ২৫-২৬ অর্থবছরে মালামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির দোহাই দিয়ে ঠিকাদার অপারগতা প্রকাশ করায় আমরা টেন্ডারটি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছি।

বর্তমানে নতুনভাবে ২৬-২৭ অর্থবছরের ‘পল্লী সড়ক সেতু রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির’ আওতায় নতুন প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হচ্ছে।

জেলা অফিসে দ্রুত মিটিংয়ের মাধ্যমে অনুমোদন নেওয়া হবে। আশা করছি এই বছরের মধ্যেই নতুন টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত কাজ শুরু করতে পারব।”

কাগজে-কলমে নতুন অর্থবছরের প্রাক্কলন ও অনুমোদনের আশ্বাস মিললেও, লোহাগাড়ার জঙ্গল পদুয়াবাসীর সংশয় কাটছে না। বছরের পর বছর প্রশাসনিক ফাইল চালাচালি আর ঠিকাদারি বাহানার বলি হয়ে কেন হাজার হাজার মানুষকে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলতে হবে-সে প্রশ্ন এখন প্রকট।

সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও দুর্নীতি দমনমূলক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতার জবাবদিহি নিশ্চিত করবে এবং কালক্ষেপণ না করে দ্রুত সড়ক সংস্কারের বাস্তব পদক্ষেপ নেবে-এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি