back to top

খাতুনগঞ্জে সস্তা-খুচরায় আগুন, মসলার বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৈষম্য!

প্রকাশিত: ১৯ মে, ২০২৬ ১৪:১৪

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের মসলার বাজারে এখন সরবরাহে স্বস্তির চিত্র থাকলেও ভোক্তা পর্যায়ে দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিক মূল্যবৈষম্য।

দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে মসলার দাম স্থিতিশীল থাকলেও নগরের খুচরা বাজারে একই পণ্যের দাম অনেক ক্ষেত্রে প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত বেড়েছে।

ফলে ঈদের প্রস্তুতিতে থাকা মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের রান্নাঘরের হিসাব-নিকাশে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ভারত থেকে নিয়মিত মসলা আমদানির কারণে বাজারে কোনো ধরনের সরবরাহ সংকট নেই। পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় পাইকারি পর্যায়ে দামও মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।

তবে সেই স্বস্তির প্রতিফলন খুচরা বাজারে মিলছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতাদের অতিরিক্ত মুনাফা, পণ্যের মানভেদ এবং অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থার কারণে দামের ব্যবধান বেড়ে যাচ্ছে।

চাক্তাই–খাতুনগঞ্জের সঙ্গে নগরের বিভিন্ন খুচরা বাজারের তুলনায় দেখা গেছে, জায়ফল পাইকারিতে ৭৫০ টাকা কেজি হলেও খুচরায় তা ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। দারুচিনি পাইকারিতে ৩৫০ থেকে ৪৪০ টাকা থাকলেও খুচরায় উঠেছে প্রায় ৬০০ টাকা পর্যন্ত।

একইভাবে ১ হাজার ২০ টাকার গোলমরিচ খুচরা বাজারে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এলাচ, জিরা, হলুদ ও শুকনা মরিচসহ প্রায় সব মসলার ক্ষেত্রেই একই ধরনের মূল্যবৈষম্য লক্ষ করা গেছে।

বিশেষ করে এলাচ ও জিরার বাজারে দামের পার্থক্য সবচেয়ে বেশি। খাতুনগঞ্জে এলাচের দাম মানভেদে ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে থাকলেও খুচরায় তা ৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। চিকন জিরা পাইকারিতে ৫২৫–৫৩৫ টাকা হলেও খুচরায় ৬২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ১০ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিপুল পরিমাণ মসলা আমদানি হয়েছে বলে বন্দর ও ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে।

এর মধ্যে দারুচিনি ১৩ হাজার ২৯৬ টন, জিরা ৩ হাজার ১১৫ টন, গোলমরিচ ১ হাজার ৯৫৯ টন, এলাচ ১ হাজার ১৫০ টন, লবঙ্গ ১ হাজার ৩৫০ টন, আদা ৪৫ হাজার ৫৩৮ টন এবং রসুন ৫৩ হাজার ১০১ টন আমদানি হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়েও নিয়মিত মসলা দেশে প্রবেশ করছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কার্যালয়ের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, “এলাচ, জিরাসহ কিছু গরম মসলা চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়েও আমদানি হচ্ছে। ফলে বাজারে সরবরাহে কোনো সংকট নেই।”

সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও খুচরা বাজারে দামের এই ব্যবধান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা।

তাঁদের অভিযোগ, বাজারে নজরদারির ঘাটতি এবং অতিমুনাফার প্রবণতার কারণে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

চাক্তাই–খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজারে দাম ওঠানামা করলেও খুচরা পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মুনাফা নেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে বাজারে আরেকটি উদ্বেগের দিক হলো চোরাচালান ও ভেজাল। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে জিরার সঙ্গে ক্যারাওয়ে বীজ মেশানোর ঘটনা ধরা পড়েছে।

অতীতেও নিম্নমানের মসলা গুঁড়া করা কিংবা ভুষি মেশানোর মতো অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে খোলা মসলার প্রতি ক্রেতাদের আস্থা কিছুটা কমেছে।

আমদানিকারক জেকে ট্রেডার্স বলেন, চোরা পথে এতো মসলা ঢুকেছে যে দারচিনি, এলাচ, লবঙ সব এখন আমদানি করা দামের চেয়েও কম তাহলে কিভাবে ব্যাবসা করবো? আমাদের আমদানি করাটায় বন্ধ করে দিতে হবে।

ঈদকে কেন্দ্র করে অনেক পরিবার এখন গোটা মসলা কিনে নিজ উদ্যোগে গুঁড়া করে রাখছেন। নগরের বিভিন্ন কলঘরগুলোতেও এখন ব্যস্ততা বেড়েছে। এখানে মরিচ-মসলা গুঁড়া করতে কেজিপ্রতি ৪০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।

ক্রেতাদের মধ্যে অনেকে বলছেন, খোলা গুঁড়া মসলায় ভেজালের ঝুঁকি থাকায় তারা গোটা মসলা কিনে নিজেরাই পরিষ্কার করে গুঁড়া করে ব্যবহার করছেন। এতে খরচ কিছুটা বাড়লেও মান নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায়।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এবার আগের বছরের মতো মসলার চাহিদা ততটা বাড়েনি।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ছোট পরিবারের প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে গোটা মসলার ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কমেছে। পাশাপাশি প্যাকেটজাত মসলার প্রতি ঝোঁকও বাড়ছে।

বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি অমর কান্তি দাশ বলেন, বাজারে সরবরাহ থাকলেও ক্রেতা কম।

পাশাপাশি চোরাচালানের কারণে বৈধ আমদানিকারকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। উচ্চ শুল্কও বাজারে দামের চাপ তৈরি করছে।

আমদানিকারকদের দাবি, জিরায় প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি শুল্ক দিতে হয়। এলাচে কেজিপ্রতি ৬৫০ টাকা এবং গোলমরিচে ২২০ টাকা শুল্ক আরোপ রয়েছে।

এই উচ্চ শুল্কের কারণে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী স্থলবন্দর দিয়ে অবৈধভাবে পণ্য এনে বাজারে ছাড়ছেন, ফলে বৈধ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।

ব্যবসায়ীদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরে নজরদারি তুলনামূলক জোরদার হলেও স্থলবন্দরগুলোতে তদারকি দুর্বল। ফলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে।

এদিকে ঈদ সামনে রেখে পেঁয়াজের বাজারে কিছুটা স্বস্তির চিত্র রয়েছে। পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রচুর দেশি পেঁয়াজ আসছে। বর্তমানে মানভেদে আড়তে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩২ থেকে ৪০ টাকায়।

সব মিলিয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও খুচরা বাজারে অতিমুনাফা, নজরদারির দুর্বলতা এবং ভেজালের শঙ্কা—সব মিলিয়ে ঈদুল আজহা সামনে রেখে মসলার বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আর এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে সাধারণ ভোক্তার রান্নাঘরে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিনি/আরএসপি