চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও পর্যটন করিডর। প্রতিদিন হাজারো যানবাহনের চাপ বহন করা এই সড়কের উন্নয়নকাজ ঘিরে উঠেছে ভয়াবহ অনিয়ম, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, ভুয়া বিল এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ।
স্থানীয়দের দাবি, জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো একশ্রেণির ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর জন্য লাভজনক বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা এবং উপসহকারী প্রকৌশলী আবু হানিফ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে কাজের তদারকি, বিল পরিশোধ ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারে ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়ম হচ্ছে।
কমিশনের বিনিময়ে ঠিকাদারদের দায়সারা কাজের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে লোহাগাড়ার চুনতি–জাঙ্গালিয়া অংশে চলমান চার লেন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে।
দুর্ঘটনাপ্রবণ হওয়ায় স্থানীয়দের কাছে ‘মৃত্যুকূপ’ নামে পরিচিত এই এলাকায় সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক উন্নয়নকাজ শুরু হলেও বাস্তবে সেখানে মাটিযুক্ত নিম্নমানের বালি ও মানহীন উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
তাঁদের আশঙ্কা, এমন নিম্নমানের নির্মাণ ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চার লেন নির্মাণকাজ চললেও সড়কের মাঝখানে এখনো দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটি বিদ্যুতের খুঁটি। রয়েছে সড়ক ও জনপদ বিভাগের বড় বিলবোর্ডও।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুতের খুঁটি অপসারণে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগ বিদ্যুৎ বিভাগকে চিঠি দিলেও অর্থ পরিশোধ না করায় খুঁটি সরানোর কাজ এগোয়নি।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ বিভাগ খুঁটি অপসারণে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করায় এখনো টাকা জমা দেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে ভেজা বালি দিয়ে ভরাট এবং অপর্যাপ্ত উপকরণ ব্যবহার করে দ্রুত কাজ শেষ করার প্রবণতাও দেখা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ তদারকি না থাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো খরচ কমাতে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করছে। সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ কমিশনের বিনিময়ে এসব অনিয়ম নীরবে অনুমোদন দিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সওজ সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে টেন্ডার কারসাজি, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে গোপনীয় প্রাক্কলন ফাঁস, বিশেষ শর্ত সংযোজন এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ ভাগাভাগির অভিযোগ রয়েছে।
আংশিক কাজ শেষ করেও ভুয়া মাস্টাররোল ও বিল দাখিলের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণকাজে রড, সিমেন্ট, বিটুমিন ও খোয়ার পরিমাণ কম ব্যবহার করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা উপেক্ষা করা হচ্ছে।
এমনকি রাস্তা পরিদর্শন বা ত্রুটি যাচাই ছাড়াই ঠিকাদারদের বিল ছাড়ের ঘটনাও ঘটছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সওজ সূত্রে জানা গেছে, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া অংশে প্রায় ১০০ কোটি টাকার তিনটি প্যাকেজে উন্নয়নকাজ চলছে। এর মধ্যে লোহাগাড়ার চুনতির মিঠার দোকান এলাকা থেকে জাঙ্গালিয়া পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার অংশ প্যাকেজ–৩-এর আওতায় উন্নয়ন করা হচ্ছে।
এই প্রকল্পে মহাসড়কের দুই পাশে ৬ ফুট করে প্রশস্ত করা হবে এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ জাঙ্গালিয়া এলাকায় প্রায় ৯০০ মিটার অংশ ডিভাইডারসহ চার লেনে উন্নীত করা হবে। এ অংশে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
এ ছাড়া সাতকানিয়া রাস্তার মাথা থেকে লোহাগাড়ার রাজঘাটা পর্যন্ত ৮ দশমিক ৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি টাকা। রাজঘাটা থেকে চুনতি মিঠার দোকান পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার অংশে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ কোটি টাকা।
এই তিনটি প্যাকেজের কাজ বাস্তবায়ন করছে এম এ এইচ কনস্ট্রাকশন এবং এম এ কনস্ট্রাকশন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পগুলোতে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের একটি অংশের মধ্যে শক্তিশালী কমিশনভিত্তিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ফলে নির্মাণমানের চেয়ে দ্রুত বিল উত্তোলন ও অর্থ ভাগাভাগিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক শুধু একটি সড়ক নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, পর্যটন ও দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম প্রাণরেখা।
অথচ এই মহাসড়কের উন্নয়নকাজে যদি দুর্নীতি ও অনিয়ম ঢুকে পড়ে, তাহলে জননিরাপত্তা ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ‘মৃত্যুকূপ’ নামে পরিচিত জাঙ্গালিয়া এলাকায় গত এক বছরে ছোট–বড় প্রায় অর্ধশত দুর্ঘটনায় অন্তত ৭৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে।
সর্বশেষ চলতি মাসের ৯ মে মারসা পরিবহনের দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে চারজন নিহত ও অন্তত ১৫ জন আহত হন।
এর আগে গত বছরের ৯ অক্টোবর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণকাজে সর্বনিম্ন ২৯ হাজার ২৩০ কোটি থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সওজের উন্নয়ন প্রকল্পে সার্বিক দুর্নীতির হার ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত।
প্রকল্প কাজের অগ্রগতি ও অভিযোগ সম্পর্কে কথা বলতে নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোন আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। উপসহকারী প্রকৌশলী আবু হানিফের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। তারা মন্তব্য জানালে প্রতিবেদনে তা সংযুক্ত করে সংশোধন করা হবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



