বদলে যাচ্ছে অপরাধ তদন্তের চিত্র,সাইবার অপরাধীদের আর নিস্তার নেই, জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

৮ বিভাগে হচ্ছে হাইটেক ফরেনসিক ল্যাব

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১৫:১৯

যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরনও বদলে গেছে। সাধারণ অপরাধের সীমা ছাড়িয়ে অপরাধীরা এখন জাঁকিয়ে বসেছে ডিজিটাল দুনিয়ায়।

সাইবার প্রতারণা থেকে শুরু করে শেয়ারবাজারের বড় বড় কারসাজি, সবই ঘটছে অদৃশ্য নেটওয়ার্কে। কিন্তু এই অদৃশ্য অপরাধীদের আর কোনো ছাড় নয়!

সাইবার অপরাধ শনাক্তকরণ, ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ এবং মুহূর্তেই অপরাধী শনাক্ত করতে বাংলাদেশ পুলিশে যুক্ত হলো আধুনিক প্রযুক্তির এক নতুন শক্তি।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ লাইন্সের দামপাড়ায় এক জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদ্বোধন করা হলো বহুল প্রতীক্ষিত ‘সাইবার পুলিশ কেন্দ্র ও ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগার’।

কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় নির্মিত এই সেন্টার ও ল্যাব প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ তদন্তে চট্টগ্রাম তথা পুরো দেশের পুলিশের জন্য এক নতুন যুগের সূচনা করলো।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এক বড় ঘোষণা দিয়ে জানান, চট্টগ্রামেই শেষ নয়, সাইবার অপরাধের এই আধুনিক জাল বিস্তার করা হবে দেশজুড়ে।

খুব দ্রুতই দেশের আটটি বিভাগীয় সদরে স্থাপন করা হবে একই ধরনের ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগার।

শুধু বিভাগীয় শহর নয়, সাইবার অপরাধ শনাক্ত ও দমনে কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত তদন্ত সক্ষমতা বাড়াতে সরকার সমন্বিত উদ্যোগ নিচ্ছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আজ আমরা সাইবার পুলিশ অফিস ও ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব উদ্বোধন করলাম।

কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের সরকার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা ‘কোইকা’র (KOICA) আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় এই পুরো মহতী কাজটি সম্পন্ন হয়েছে।

এ সময় তিনি কোরীয় সরকার, দেশটির রাষ্ট্রদূত, কোইকা প্রতিনিধি ও সফররত বিদেশি প্রতিনিধিদলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

তিনি আরও জানান, একটি বিশেষায়িত পুলিশ সাইবার ইউনিট প্রতিষ্ঠার কথা অনেক দিন ধরেই ভাবা হচ্ছিল। অবশেষে গত ১ অক্টোবর থেকে একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশের এই বিশেষায়িত ইউনিট পথচলা শুরু করেছে।

নতুন এই ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবটি অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অধীনে পরিচালিত হবে। তবে ডিজিটালাইজড প্রমাণাদি বিশ্লেষণে পুলিশের সবকটি বিভাগের মধ্যে যেন নিখুঁত সমন্বয় থাকে, তা নিশ্চিত করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে এবং সাধারণ মানুষের দ্রুত বিচার পাওয়া নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য-প্রমাণ ও ফরেনসিক প্রমাণের বিকল্প নেই।

যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পুলিশকে সব ধরণের আধুনিক প্রযুক্তিগত সরঞ্জামে সজ্জিত করা হচ্ছে। একইসঙ্গে সিআইডির প্রতিষ্ঠাকালীন রাসায়নিক পরীক্ষাগার কার্যক্রমকেও আরও সম্প্রসারণ করার কথা জানান তিনি।

সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সম্ভাব্য নাশকতার চেষ্টা বা বিরোধী দলের আন্দোলন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, সব বিষয়ে আমাদের দায়িত্ব আছে, তবে আমাদের সামনে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই।

তদন্ত বা আসামি গ্রেপ্তারে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, অপরাধ দমন করতে গিয়ে পুলিশ মাঝেমধ্যে হামলার শিকার হয়, এটি নতুন কিছু নয়। তবে অপরাধীদের দমনে পুলিশ প্রশাসন সর্বাত্মক কঠোর।

আসামি গ্রেপ্তারের সময় কেউ যদি অপরাধীকে ছিনিয়ে নিতে বা সহায়তা করতে আসে, তবে তার বিরুদ্ধেও সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কোরীয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (কোইকা) সহায়তায় নেওয়া প্রকল্পটি ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত হয়। একই বছরের ১৫ মে প্রশাসনিক আদেশ জারির মাধ্যমে প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়।

প্রায় ৫৯ কোটি ৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের আওতায় ১০ তলা ভবনের ভিত্তির ওপর চারতলা ভবন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি সিআইডি সদর দপ্তরে সাইবার পুলিশ কেন্দ্র ও ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।

সাইবার অপরাধ তদন্তে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে ইতোমধ্যে তিনটি দেশীয় ও আটটি বিদেশি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। নতুন পরীক্ষাগার ও প্রশিক্ষিত জনবল সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো গেলে ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ তদন্তে পুলিশের সক্ষমতা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রদূত কিম জি-জুন, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির।

এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক সরদার নুরুল আমিন এবং কোইকার বাংলাদেশ কার্যালয়ের পরিচালক জি-হুন কিম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অপরাধ তদন্ত বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি