বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে ছেড়েছিল ১৯৭ রোল আমদানি করা দামি কাপড়। গন্তব্য ছিল নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেডের বিখ্যাত ‘এপিক গার্মেন্টস’।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে কাভার্ডভ্যান যখন ছুটছিল, পরিবহন সংস্থার ট্র্যাকিং স্ক্রিনে তখন শুধুই সবুজ বাতি। কিন্তু রাতের আঁধারে হঠাৎ দিক বদলাল গাড়িটি। নারায়ণগঞ্জ না গিয়ে তা হঠাৎ ঢুকে পড়ল ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে।
আর এর পরেই জিপিআরএস ট্র্যাকার ও চালকের ফোন-সব একসঙ্গে নিভে গেল। ৪ দিন পর গাজীপুর থেকে খালি গাড়ি উদ্ধার হলেও হাওয়া হয়ে যায় ৮০ লাখ টাকার মালামাল।
যেন রোমাঞ্চকর কোনো ক্রাইম থ্রিলারের চিত্রনাট্য! তবে এটি সিনেমা নয়, বাস্তবেরই এক দুর্ধর্ষ অভিনব চুরির ঘটনা।
তবে শেষ রক্ষা হয়নি-সেই ক্লুলেস রহস্যের জট ছুটিয়ে অবশেষে এসআরবি-৭ এর জালে ধরা পড়েছে মূল চক্রের দুই মাস্টারমাইন্ড।
মামলার এজাহার ও তদন্তের তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, গত ৮ অক্টোবর বিকেল ৫টায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাইশা এন্টারপ্রাইজ ও শাহরিয়ার অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেডের একটি মালবাহী কাভার্ডভ্যানে ১৯৭ রোল বিদেশি কাপড় লোড করা হয়। গাড়িটি সামলাচ্ছিলেন প্রতিষ্ঠানের বেতনভুক্ত চালক মোহাম্মদ ইয়াসিন।
পরিবহন সংস্থাটি আধুনিক জিপিআরএস (GPRS) প্রযুক্তির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক গাড়িটির গতিপথ পর্যবেক্ষণ করছিল। রাত ১১টার দিকে ট্র্যাকিং স্ক্রিনে দেখা যায়, কাভার্ডভ্যানটি নির্ধারিত পথ নারায়ণগঞ্জ না গিয়ে পৌঁছায় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে। ঠিক ৫০ মিনিট পর-রাত ১১টা ৫০ মিনিটে সেটির অবস্থান দেখায় তেজগাঁও এলাকায়!
সংস্থাটির কর্মকর্তাদের সন্দেহ হলে তারা অবিলম্বে চালক ইয়াসিনকে ফোন করেন।
ফোনের ওপাশ থেকে শান্ত গলায় ইয়াসিনের উত্তর ছিল, গাড়ির ইলেকট্রিক সংযোগে সমস্যা হয়েছে, আর আমার ফোনটাও নষ্ট। এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
বন্ধ হয়ে যায় চালকের ফোন, একই সাথে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে গাড়ির জিপিআরএস ট্র্যাকার ট্র্যাকিং।
চালকের উধাও হয়ে যাওয়া এবং ৮০ লাখ টাকার মালামালের খোঁজে তল্লাশি শুরু করে পরিবহন সংস্থাটি।
ঘটনার চার দিন পর, গত ১২ অক্টোবর দুপুর আড়াইটার দিকে গাজীপুরের টঙ্গী পশ্চিম থানার মাছিমপুর এলাকায় মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ফটকের পাশ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় কাভার্ডভ্যানটি উদ্ধার করা হয়।
কিন্তু তালা খুলতেই দেখা যায়-পুরো গাড়ি ফাঁকা! একটি রোলেরও সন্ধান মেলেনি।
ঘটনার পরদিন (১৩ অক্টোবর) পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাদ্দাম হোসেন বাদী হয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়-চালক ইয়াসিন অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনের যোগসাজশে অভিনব কায়দায় কাপড়গুলো সরিয়ে চড়া দামে বিক্রি করে দিয়েছেন।
ছায়াতদন্তে নেমে চট্টগ্রাম ও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সোর্স নেটওয়ার্ক সক্রিয় করে এসআরবি-৭। গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর থানার বড়পুল এলাকায় অভিযান চালায় এসআরবির একটি বিশেষ দল।
অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় চক্রের দুই প্রভাবশালী সদস্যকে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন-মোহাম্মদ গোলাম রহমান মুন্না (৪৬) ও মোহাম্মদ আমানুল্লাহ (৬৩)।
এসআরবির পক্ষ থেকে শুক্রবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত দুজনই টঙ্গী পশ্চিম থানায় দায়ের করা এই দুর্ধর্ষ মামলার তদন্তে উঠে আসা এজাহারনামীয় ও প্রাপ্ত প্রধান আসামি।
চালক ইয়াসিন ও মালামাল ক্রয়ের সাথে জড়িত বাকি চক্রটিকে ধরতে বর্তমানে যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


