বিশেষ প্রতিবেদন : চাকরির প্রথম সমুদ্রযাত্রা—স্বপ্নের শুরুটা হওয়ার কথা ছিল রোমাঞ্চে ভরা। কিন্তু সেই যাত্রাই পরিণত হলো বিভীষিকায়।
আরব সাগরের বুকে মিসাইল হামলায় মুহূর্তেই আগুনে পুড়ে ওঠে জাহাজ, মৃত্যু যেন ছায়ার মতো তাড়া করে ফেরে তরুণ নাবিক এহসান সাবরি রিহাদকে।
চীনের সাংহাই থেকে ওমানগামী পানামার পতাকাবাহী ‘এমভি গোল্ড অটাম’ জাহাজে ছিলেন তিনি।
কক্সবাজারের এই তরুণ ইঞ্জিন ক্যাডেটের জন্য এটি ছিল প্রথম সমুদ্রযাত্রা—আর সেই যাত্রাতেই জীবন-মৃত্যুর লড়াই।
বিকট শব্দ, তারপর আগুন
গেল মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টা। খাবার শেষে বিশ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রিহাদ। হঠাৎই বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো জাহাজ।
রিহাদ বলেন, ‘দ্রুত ইঞ্জিনকক্ষে গিয়ে দেখি সব ঠিক আছে। উপরে আসতেই দেখি ক্রেনের নিচে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তখনই বুঝলাম আমরা হামলার শিকার হয়েছি।’
মুহূর্তেই বিভীষিকা
২২ জন নাবিকের সেই জাহাজে ছিলেন ৬ জন বাংলাদেশি। প্রথম বিস্ফোরণের পর নিরাপদ আশ্রয়ে জড়ো হওয়ার আগেই আঘাত হানে দ্বিতীয় মিসাইল।
কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে প্রাণে বেঁচে যান তারা। কিন্তু ততক্ষণে জাহাজে ছড়িয়ে পড়ে আগুন, বিকল হয়ে যায় ইঞ্জিন, একপাশে দেখা দেয় ফাটল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ক্যাপ্টেন জাহাজ পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন।
আগুনে পুড়ছে জাহাজ, থেমে নেই চেষ্টা
জাহাজের প্রায় সব অংশেই তখন আগুন জ্বলছে। পণ্য হিসেবে থাকা বড় বাসগুলো পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়। নাবিকরা চেষ্টা চালান আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার, পাশাপাশি ইঞ্জিন সচল করার। কিন্তু ব্যর্থ হন।
শেষ পর্যন্ত সবাই জড়ো হন জাহাজের পেছনের ডেকে—যেখানে তখনো আগুন পুরোপুরি ছড়ায়নি।
লাইফবোটেও নিরাপত্তা নেই
রিহাদসহ চারজন একটি লাইফবোটে করে সাগরে নামেন। কিন্তু সেখানেও বিপদ পিছু ছাড়েনি। বোমার আঘাতে লাইফবোটের ইঞ্জিনও অচল। উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ছিল ভেতরে।
রিহাদ বলেন,‘মনে হচ্ছিল আজই জীবনের শেষ দিন। বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়ে শুধু আল্লাহর নাম নিচ্ছিলাম।’
সাত ঘণ্টার অনিশ্চয়তা
সাগরে ভেসে থাকতে থাকতে তারা যোগাযোগ করেন আরেকটি জাহাজের সঙ্গে। স্যাটেলাইট ফোনে মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা হয়। পরে পাকিস্তান নৌবাহিনীর সহায়তা চাওয়া হয়।
প্রায় সাত ঘণ্টা পর রাত সাড়ে আটটার দিকে একটি মালবাহী জাহাজ তাদের দেখতে পায়। শুরু হয় উদ্ধার অভিযান।
পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজ ‘পিএনএস হুনাইন’ এসে বাংলাদেশি ৫ জনসহ ১৮ নাবিককে উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃতরা এখন করাচি বন্দরে নিরাপদে আছেন।
তবে জাহাজের ক্যাপ্টেনসহ আরও ৪ জন এখনো পরিত্যক্ত জাহাজে অবস্থান করছেন। সমুদ্র শান্ত হলে সেটিকে ওমান উপকূলে নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
ফেরার অপেক্ষা
রিহাদসহ অন্য বাংলাদেশি নাবিকদের দ্রুত দেশে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। এ কাজে কাজ করছে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন।
মৃত্যুকে এত কাছ থেকে দেখে ফিরে আসা এই তরুণের কাছে প্রথম সমুদ্রযাত্রা এখন শুধুই এক দুঃস্বপ্ন—তবু সেই দুঃস্বপ্ন পেরিয়েই বেঁচে থাকার গল্প লিখছেন তিনি।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



