চট্টগ্রামের মানুষ যখন প্রতিদিন মশার কামড়ে অতিষ্ঠ, ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগের আতঙ্কে উদ্বিগ্ন, তখন সেই মশা নিধনের ‘উদ্ভাবনী কৌশল’ দেখতে যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)র মেয়রসহ ছয় কর্মকর্তা।
গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও শিকাগো। উদ্দেশ্য—মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছানোর পর সেই পরিকল্পনা থেমে যায় একটি মাত্র মন্তব্যে। আর সেই মন্তব্য এখন প্রশাসনিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষায়, “মশকনিধন শেখা বা দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যাওয়ার দরকার নেই।
দেশেই সন্ধ্যার পর যেকোনো ডোবার পাশে দু–তিন ঘণ্টা অবস্থান করলেই মশকনিধনের অনেক উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব হবে।”
একটি বাক্য। কিন্তু সেই বাক্যের মধ্যেই যেন উঠে এসেছে দেশের নগর ব্যবস্থাপনা, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং নাগরিক দুর্ভোগের পুরো চিত্র।
বিদেশ সফরের প্রস্তাব কী ছিল?
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানিয়েছে, মশকনিধনের উদ্ভাবনী কার্যক্রম পরিদর্শনের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠান ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসির অর্থায়নে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একটি প্রতিনিধিদলের যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
প্রস্তাব অনুযায়ী, মেয়র শাহাদাত হোসেনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি দল যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও শিকাগো সফরে যাওয়ার কথা ছিল। সফরে একটি কারখানা এবং একটি ল্যাবরেটরি পরিদর্শনের পরিকল্পনাও ছিল।
প্রতিনিধিদলে থাকার কথা ছিল—চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির চৌধুরী, ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা।
সফরের অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সারসংক্ষেপ পাঠানো হলে সেখান থেকেই আসে ‘না’।
অনুমোদন মেলেনি:
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ জানান, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে বিদেশ সফরের অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র সফরের পুরো পরিকল্পনাই বাতিল হয়ে যায়।
প্রশ্নের মুখে প্রয়োজনীয়তা :
ঘটনাটির সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো—চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে মশা নিধনের জন্য প্রায় পৌনে চার কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক প্রযুক্তির কীটনাশক বিটিআই (বাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস) ক্রয় করেছে। বর্তমানে সেই ওষুধ মাঠপর্যায়ে ব্যবহারও করা হচ্ছে।
এখানেই উঠছে স্বাভাবিক প্রশ্ন—যদি আধুনিক প্রযুক্তির কীটনাশক ইতোমধ্যে সংগ্রহ ও প্রয়োগ করা হয়ে থাকে, তাহলে মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ফলাফল কোথায়?
আর যদি সমস্যা এখনো বহাল থাকে, তাহলে তার কারণ কি প্রযুক্তির অভাব, নাকি বাস্তবায়নের দুর্বলতা?
অনেকের মতে, মশার জন্মস্থান ড্রেন, খাল, নালা, জলাবদ্ধতা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে।
এসব জায়গা পরিষ্কার ও নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে যে কাজ করা সম্ভব, তার জন্য বিদেশ সফর কতটা জরুরি ছিল—সেই প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।
প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের অন্তর্নিহিত বার্তা:
প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যকে অনেকেই কেবল একটি সফর বাতিলের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না।
বরং এটি স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি একটি সরাসরি বার্তা-সমস্যা বুঝতে হলে আগে মাঠে যেতে হবে, জনগণের বাস্তবতা দেখতে হবে, মশার উৎপত্তিস্থল চিহ্নিত করতে হবে।
কারণ চট্টগ্রামের নাগরিকদের কাছে মশা কোনো গবেষণাগারের বিষয় নয়, এটি প্রতিদিনের ভোগান্তি। সন্ধ্যা নামলেই অসংখ্য এলাকায় মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। ডেঙ্গু মৌসুম এলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এ বাস্তবতায় বিদেশি অভিজ্ঞতা যতই মূল্যবান হোক, নাগরিকরা শেষ পর্যন্ত দেখতে চান একটি ফল—মশা কমেছে কি না।
নাগরিকদের প্রশ্ন এখন একটাই
ফ্লোরিডার সফর বাতিল হয়েছে। কিন্তু বিতর্ক থামেনি। বরং নতুন করে সামনে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—মশা নিয়ন্ত্রণের লড়াই কি বিদেশি অভিজ্ঞতার অভাবে পিছিয়ে আছে, নাকি মাঠপর্যায়ে দায়িত্বশীল ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার ঘাটতিই মূল সমস্যা?
কারণ নাগরিকদের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্ভাবন কোনো বিদেশ সফর নয়, সবচেয়ে বড় উদ্ভাবন হবে এমন একটি শহর, যেখানে সন্ধ্যার পর জানালা খুলে বসা যায়, আর মশার ঝাঁক তাড়া করে বেড়ায় না।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



