রাউজানে সোমবারের দুপুরটা শুরু হয়েছিল এক প্রবাসী স্বামীর অপ্রত্যাশিত প্রত্যাবর্তনের আনন্দ নিয়ে।
দীর্ঘদিন পর দুবাই থেকে দেশে ফিরেছিলেন নয়ন শীল। কাউকে কিছু না জানিয়ে, স্ত্রীকে চমকে দিতে হঠাৎ করেই বাড়িতে পৌঁছেছিলেন তিনি।
কিন্তু যে মানুষটিকে ঘিরে এতদিনের অপেক্ষা, সেই মানুষটিকেই খুঁজে পাওয়া গেল জীবনের সবচেয়ে নির্মম ও বেদনাদায়ক অবস্থায়।
বাড়িতে ফেরার প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার করা হয় তার স্ত্রী প্রিয়া শীলের (২৬) ঝুলন্ত মরদেহ।
সোমবার (১ জুন) দুপুরে চট্টগ্রামের রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম রাউজান বাইন্যপুকুর পাড় এলাকায় ঘটে হৃদয়বিদারক এ ঘটনা।
নিহত প্রিয়া শীল হাটহাজারী উপজেলার সরকারহাট এলাকার সুলাল শীল ও রুপ্না শীল দম্পতির মেয়ে।
স্বজনদের ভাষ্য, ২০১৯ সালে পারিবারিকভাবে প্রিয়ার সঙ্গে নয়ন শীলের বিয়ে হয়।
সাত বছরের দাম্পত্য জীবন পেরিয়ে গেলেও তাদের কোলজুড়ে কোনো সন্তান আসেনি। সেই না-পাওয়ার বেদনা, অপূর্ণতার চাপ আর পারিবারিক টানাপোড়েন নীরবে জমে উঠেছিল তাদের সংসারে।
নয়ন শীল জানান, স্ত্রীকে চমকে দেওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়ের আগেই তিনি দুবাই থেকে দেশে ফেরেন।
সোমবার সকালে বাড়িতে পৌঁছানোর পর কিছুক্ষণ স্ত্রীকে দেখতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
একপর্যায়ে বাড়ির পাশের একটি বাথরুমে গিয়ে ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া পাননি। পরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখেন, গলায় শাড়ি পেঁচানো অবস্থায় ঝুলছেন প্রিয়া।
সঙ্গে সঙ্গে স্বজনদের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন।
মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনে ছুটে আসা মা রুপ্না শীলের কণ্ঠে তখন শুধু কান্না আর অসহায়তার আর্তনাদ।
তিনি বলেন, শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রথমে তাদের জানানো হয়েছিল প্রিয়া নালায় পড়ে গেছে এবং হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
পরে এসে দেখেন, তার মেয়ে আর বেঁচে নেই। সন্তান না হওয়া নিয়ে মেয়ের সংসারে নানা সমস্যা ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রুপ্না শীল জানান, গত ১৯ মে প্রিয়া বাবার বাড়িতে এসেছিলেন। তখন মেয়ের মধ্যে অস্বস্তি ও মানসিক চাপের ছাপ দেখতে পেয়েছিলেন তারা। তবে এত বড় একটি ঘটনা ঘটবে, তা কল্পনাও করেননি।
প্রিয়ার ছোট বোন প্রিয়ংকা শীল ও ছোট ভাই বিজয় শীলের মনে ঘটনার অনেক প্রশ্ন এখনো উত্তরহীন।
তাদের দাবি, যদি প্রিয়া আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকতেন, তাহলে অনেক আগেই তা করতে পারতেন।
স্বামীর আকস্মিক দেশে ফেরার পরপরই এমন ঘটনা ঘটায় তাদের কাছে পুরো বিষয়টি রহস্যজনক মনে হচ্ছে।
তারা জানান, নয়ন শীলের দেশে ফেরার কথা ছিল আগামী ১০ জুন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগেই তিনি দেশে ফিরে আসেন।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য ছিল বলে শুনেছেন, তবে বিরোধের প্রকৃত কারণ তারা জানেন না। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে পরিবারের অন্য সদস্যদের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। নিহতের ভাসুর অশোক শীল ও তার ছেলে দীপ্ত শীল জানান, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বড় ধরনের কোনো বিরোধ তাদের নজরে আসেনি। কী কারণে এমন মর্মান্তিক পরিণতি ঘটল, সে বিষয়ে তারাও নিশ্চিত নন।
ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল শেষে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে।
রাউজান থানার তদন্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) নিজাম উদ্দিন দেওয়ান বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, দাম্পত্য জীবনে কিছু পারিবারিক বিরোধ ছিল।
তবে মরদেহে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যা বলে মনে হলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এখন পশ্চিম রাউজানের সেই বাড়িটিতে নেই কোনো চমকের আনন্দ, নেই প্রবাসফেরত স্বামীকে ঘিরে উচ্ছ্বাস।
আছে শুধু এক তরুণীর অসমাপ্ত জীবনের গল্প, একটি পরিবারের বুকভাঙা কান্না আর কিছু উত্তরহীন প্রশ্ন—যার জবাব খুঁজছে স্বজনরা, খুঁজছে তদন্তকারীরাও।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



