নোয়াখালী জেলায় একের পর এক গড়ে উঠছে অবৈধ ইটভাটা। ফসলি জমি ও বসতবাড়ির একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এসব ভাটা থেকে ছড়াচ্ছে কালো বিষাক্ত ধোঁয়া।
স্থানীয়দের অভিযোগ—এই ধোঁয়া এখন শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের জীবনকেও গ্রাস করছে।
সুবর্ণচর উপজেলার চরজব্বর ইউনিয়নের পশ্চিম চরজব্বর গ্রামে সরেজমিনে দেখা যায়, “মেসার্স তাহেরা ব্রিক ফিল্ড”-এ করাতকল দিয়ে কাটা দেশীয় গাছ পুড়িয়ে ইট পোড়ানো হচ্ছে।
কয়লার পরিবর্তে কাঠ ব্যবহার করায় আশপাশের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে ঘন বিষাক্ত ধোঁয়া। এতে ফসল নষ্ট হচ্ছে, পাশাপাশি শিশু ও নারীদের মধ্যে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাটাটির কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে চলছে। একাধিকবার পরিবেশ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং মৌসুমের শুরুতে নামমাত্র অভিযান ও জরিমানা করেই দায় সারা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো-ভাটাগুলোতে ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের দিয়েও ইট তৈরি ও কাঁচামাল বহনের কাজ করানো হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, এটি এখন স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু চরজব্বর নয়, উপজেলার সুবর্ণচর ও আশপাশের এলাকায় আলিফ, এ.কে.বি, আল্লাহর দান, একতা, যমুনা, মুক্তা, মহিন, রোহান, পপুলারসহ অন্তত ১৫টি ইটভাটা অবৈধভাবে চালু রয়েছে। একই চিত্র হাতিয়া উপজেলাতেও, যেখানে প্রায় সব ভাটাই নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর নোয়াখালীর তথ্যমতে, জেলায় মোট ১১৫টি ইটভাটার মধ্যে ৫৯টি বৈধ এবং ৫৬টি অবৈধ। তবে স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি। সব মিলিয়ে দেড় শতাধিক ভাটা সক্রিয়ভাবে চলছে।
ফসলি জমির ওপর গড়ে ওঠা এসব ভাটার ধোঁয়া আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে সারাবছর। স্থানীয়রা বলছেন, এতে ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। গ্রামীণ সড়কগুলো ভারী ট্রাক চলাচলে নষ্ট হচ্ছে।
চিকিসকরা বলছেন, ইটভাটায় কয়লার পরিবর্তে কাঠ ব্যবহার করায় শিশু ও বৃদ্ধদের শ্বাসকষ্ট বাড়ছে। চোখ ও চর্মরোগের প্রকোপ দেখা দিচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করেই এসব ভাটা চলছে। মৌসুমের শুরুতে অভিযান হলেও পরে আর কোনো তদারকি থাকে না।
কিছু ক্ষেত্রে মামলা হলেও আদালতের জটিলতায় বছরের পর বছর ভাটা চালু থাকে বলে দাবি তাদের।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর নোয়াখালীর উপ-পরিচালক মোসাম্মৎ শওকত আরা কলি জানান, মৌসুমের শুরুতে ছয়টি অভিযান চালানো হয়েছে এবং এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
শিগগিরই আরও অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে সিজন শেষে অভিযান কতটা কার্যকর হবে-এ প্রশ্নে স্পষ্ট কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
আইনের কঠোর অবস্থান থাকলেও বাস্তবে অবৈধ ইটভাটার দৌরাত্ম্য থামছে না নোয়াখালীতে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু অভিযান নয়—স্থায়ী ও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ফসলি জমি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য—সবই আরও ভয়াবহ সংকটে পড়বে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



