পুরোনো বছরের ক্লান্ত ধুলো ঝেড়ে, সময়ের হাত ধরে আবারও বাংলার ঘরে ঘরে হাজির পহেলা বৈশাখ।
বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-কে বরণ করে নিতে নতুন সূর্যের আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে পুরোনো দুঃখ-অবসাদ, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে নতুন শুরুর আহ্বান—‘নব আনন্দে জাগো আজি।’
এই দিনে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরা একসূত্রে বাঁধা পড়ছেন উৎসবের অদৃশ্য বন্ধনে।
ঢাকের তালে, আলপনার রঙে, শোভাযাত্রার উল্লাসে নতুন বছরকে বরণ করে নিচ্ছে মানুষ। নতুন দিনের ভোরে উচ্চারিত হচ্ছে সেই চিরন্তন প্রার্থনা—‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’
চট্টগ্রামেও পহেলা বৈশাখ উদযাপনে নেই কোনো ঘাটতি। জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের আয়োজনে নগরজুড়ে বইছে উৎসবের আমেজ।
ডিসি হিলে ফিরেছে বর্ষবরণ
শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক আয়োজনে দিনব্যাপী উৎসব
নগরীতে সকাল ৮টায় জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ শুরু হয় সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণ থেকে। বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে শোভাযাত্রা গিয়ে শেষ হয় ডিসি হিলে। সেখানে শুরু হয় দিনব্যাপী বর্ষবরণের আয়োজন, যা চলবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত।
প্রায় অর্ধশত সাংস্কৃতিক সংগঠন এতে অংশ নিচ্ছে। বিকেলে থাকছে চিশতি বাউল সংগীত পরিবেশনা। এবারের শোভাযাত্রাকে ঘিরে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে তৈরি করা হয়েছে শতাধিক মুখোশ, শোলার মোটিফ এবং সরাচিত্র।
সার্কিট হাউস থেকে ডিসি হিল পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কে আঁকা হয়েছে বর্ণিল আলপনা। প্রায় ১০ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে চট্টগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শোভাযাত্রার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শহীদ মিনার থেকে সরে গিয়ে যৌথ আয়োজন
সিআরবি শিরীষতলায় ৬২ সংগঠনের অংশগ্রহণ
শুরুতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজনের ঘোষণা দিলেও অনুমতি না পাওয়ায় সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ ডিসি হিলের আয়োজনে সহযোগী হিসেবে যুক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে সিআরবি শিরীষতলায় ‘সম্মিলিত নববর্ষ উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম’-এর ব্যানারে হচ্ছে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের অনুষ্ঠান।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাবের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ৬২টি সংগঠন অংশ নিচ্ছে। গতকাল বর্ষবিদায়ের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া আয়োজন আজ দিনব্যাপী চলবে।
শিল্পকলা একাডেমি ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যস্ততা
দিনজুড়ে গান, নৃত্য, আবৃত্তি
জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে চৈত্র সংক্রান্তির অনুষ্ঠান শুরু হয় সোমবার বিকেলে। আজ সকাল ৯টা থেকে একাডেমির মুক্তমঞ্চে চলছে বর্ষবরণের আয়োজন।
জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ চট্টগ্রাম দুই দিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সোমবার রাতে ‘আলপনার রঙে নববর্ষ আবাহন’ অনুষ্ঠানে শতাধিক শিল্পী অংশ নেন। আজ সকালে এনায়েত বাজার মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে বেহালা বাদনের মাধ্যমে শুরু হয়েছে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।
এদিকে বোধন আবৃত্তি পরিষদের আয়োজনে জে এম সেন হল প্রাঙ্গণে চলছে ‘বোধন বর্ষবরণ উৎসব ১৪৩৩’। দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে আবৃত্তি, সংগীত, যন্ত্রসংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করছেন বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পীরা।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও উৎসবের ছোঁয়া
শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা
নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আয়োজন করা হয়েছে শোভাযাত্রা, সমবেত সংগীত, একক গান, নৃত্য ও যন্ত্রসংগীত।
সবমিলিয়ে চট্টগ্রামজুড়ে আজ পহেলা বৈশাখ মানেই উৎসব, উচ্ছ্বাস আর নতুন প্রত্যাশার জাগরণ। নতুন বছরের প্রথম দিনে সবার কামনা—আনন্দ, শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক আগামী দিনগুলো।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



