back to top

সমকামী পরিচয়ের ভুয়া গল্পে ব্রিটেনে আশ্রয়: অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য

হাজার পাউন্ডে সাজানো হচ্ছে আশ্রয়ের আবেদন

প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ০৬:১৭

ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের অভিবাসীদের একটি অংশ মিথ্যা সমকামী পরিচয় ব্যবহার করছেন—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়েছে, কিছু আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এই প্রতারণামূলক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে সহায়তা করছে এবং এর বিনিময়ে হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার পাউন্ড।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব অভিবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে, তাঁদের আশ্রয়ের আবেদনকে গ্রহণযোগ্য করতে সাজানো হচ্ছে মিথ্যা গল্প।

শুধু তাই নয়, জাল প্রমাণ তৈরি করতে বলা হচ্ছে—যার মধ্যে রয়েছে ভুয়া মেডিকেল রিপোর্ট, সাজানো ছবি এবং ভুয়া সম্পর্কের স্বীকৃতিপত্র।

এভাবে আবেদনকারীরা নিজেদের সমকামী দাবি করে দেশে ফিরলে প্রাণহানির আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে আশ্রয় প্রার্থনা করছেন।

বিবিসির তথ্যমতে, এই ধরনের আবেদনের বড় একটি অংশই বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে যাওয়া অভিবাসীদের।

ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, কেউ যদি আশ্রয়ের সুযোগের অপব্যবহার করেন, তবে তাঁকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া হবে এবং যুক্তরাজ্য থেকে বহিষ্কার করা হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, একটি ল ফার্ম ভুয়া আশ্রয় আবেদন প্রস্তুতের জন্য ৭ হাজার পাউন্ড (প্রায় ১১ লাখ ৬৬ হাজার টাকা) দাবি করে এবং আশ্বাস দেয় যে আবেদন নাকচ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া আশ্রয়প্রার্থীরা চিকিৎসকের কাছে গিয়ে বিষণ্নতার অভিনয় করছেন। এমনকি কেউ কেউ নিজেদের এইচআইভি পজিটিভ বলে মিথ্যা দাবি করছেন, যাতে তাঁদের আবেদন আরও শক্তিশালী হয়।

পরিচয় গোপন করে অনুসন্ধানে অংশ নেওয়া বিবিসির এক প্রতিবেদককে একটি ল ফার্ম পরামর্শ দেয়, তিনি সমকামী পরিচয়ে আশ্রয় পাওয়ার পর পাকিস্তান থেকে তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে আসতে পারবেন।

পরে তাঁর স্ত্রীকেও ‘লেসবিয়ান’ পরিচয়ে আলাদা আবেদন করতে বলা হবে।

প্রতিবেদনে পূর্ব লন্ডনের বেকটনের একটি কমিউনিটি সেন্টারে ‘ওরচেস্টার এলজিবিটি’ নামের একটি সংগঠনের সভার উল্লেখ করা হয়েছে।

সেখানে ১৭৫ জনের বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন। তবে উপস্থিত একজন দাবি করেন, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ০.০১ শতাংশও প্রকৃত সমকামী নন।

তানিজা খান নামে এক পরামর্শকের কাছে গোপনে গিয়ে বিবিসির প্রতিবেদক নিজেকে ছাত্র পরিচয়ে আশ্রয়সংক্রান্ত সহায়তা চান।

তখন তানিজা বলেন, “আইনত এখন কেবল একটি পথই খোলা আছে, তা হলো গে-কেস বা সমকামী হিসেবে পরিচয় দেওয়া। এখন সবাই এই পদ্ধতিই অনুসরণ করছে।”

তিনি জানান, আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকারের জন্য মিথ্যা গল্প মুখস্থ করানো হবে। গে ক্লাবে গিয়ে ছবি তোলা, এলজিবিটি ইভেন্টের টিকিট সংগ্রহ করা এবং অন্য কারও কাছ থেকে শারীরিক সম্পর্কের ভুয়া স্বীকৃতিমূলক চিঠি জোগাড় করতেও সহায়তা করা হবে।

এসব সেবার জন্য তিনি ২ হাজার ৫০০ পাউন্ড (প্রায় ৪ লাখ ১৬ হাজার টাকা) দাবি করেন।

বিবিসির অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, বার্মিংহাম ও লন্ডনভিত্তিক ‘ল অ্যান্ড জাস্টিস সলিসিটরস’-এর মাজদুল হাসান শাকিল একটি এলজিবিটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা।

যদিও তিনি সরাসরি কোনো জালিয়াতির কথা স্বীকার করেননি, তবে তানিজা খান তাঁর অফিস ও লোগো ব্যবহার করে এসব কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন।

ব্রিটিশ হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ১ লাখ আশ্রয়ের আবেদন জমা পড়েছে, যার মধ্যে ৩৫ শতাংশ আবেদনকারীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল।

এদের মধ্যে যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে আশ্রয় আবেদনকারীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে।

২০২৩ সালে পাকিস্তানি আবেদনকারীদের করা এ ধরনের ৪২ শতাংশ আবেদন অনুমোদিত হয়।

লেবার পার্টির এমপি জো হোয়াইট এবং কনজারভেটিভ দলের শ্যাডো হোম সেক্রেটারি ক্রিস ফিলপ এই ঘটনাকে ‘ভয়াবহ জালিয়াতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

অন্যদিকে, রিফিউজি কাউন্সিলের ডিরেক্টর ইমরান হুসেন বলেন, “অসাধু চক্র প্রকৃত শরণার্থীদের জীবন ও গ্রহণযোগ্যতাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।”

ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, প্রতারণামূলক আশ্রয় আবেদন একটি ফৌজদারি অপরাধ। এর শাস্তি হিসেবে কারাদণ্ড ও দেশ থেকে বহিষ্কারের বিধান রয়েছে।

ইতিমধ্যে নিয়ম আরও কঠোর করে প্রতি ৩০ মাস অন্তর এসব আবেদন পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি