চট্টগ্রামের রূপালী রূপের আড়ালে আক্ষেপ: সম্ভাবনা অপার, অথচ ভুল পথেই আটকে পর্যটন!

ক্ষত চিহ্নিত করলেন ডিসি জাহিদুল

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:৫৭

প্রকৃতি চট্টগ্রামকে দু হাত ভরে দিয়েছে। একদিকে নীল সমুদ্রের গর্জন, অন্যদিকে পাহাড়ের সবুজ হাতছানি-এমন নৈসর্গিক মেলবন্ধন পৃথিবীর খুব কম প্রান্তেই দেখা মেলে। অথচ প্রকৃতির এই অকৃপণ দানকে আমরা আন্তর্জাতিক আঙিনায় কতটা তুলে ধরতে পেরেছি?

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় ঠিক এই প্রশ্নটিই গভীর আক্ষেপের সঙ্গে তুললেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

তাঁর সাফ কথা-‘পরিকল্পনা ও গবেষণার চরম ঘাটতি, পর্যটকবান্ধব সেবার অভাব এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে সঠিক প্রচারের ব্যর্থতায় বাংলাদেশের পর্যটন খাতের বিপুল সম্ভাবনা আজও বন্দি হয়ে আছে।’

স্বল্পমেয়াদি মুনাফা নাকি দীর্ঘমেয়াদি আস্থা?
জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা জোর দিয়ে বলেন, পর্যটন খাতের টেকসই বিকাশে ‘আজকের লাভ আজই পকেটে পুরব’-এমন মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পর্যটকের নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাচ্ছন্দ্য এবং সেবার মান উন্নত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

তিনি বলেন, পর্যটকের নিরাপত্তাকে কেবল পুলিশি নিরাপত্তার ফ্রেমে বাঁধলে চলবে না। পর্যটক যা খাচ্ছেন তার বিশুদ্ধতা (খাদ্যনিরাপত্তা), স্বাচ্ছন্দ্যময় আবাসন এবং উন্নত সেবার নিশ্চয়তাই আসল নিরাপত্তা।

কার জন্য পর্যটন? অভাব সঠিক গবেষণার
চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সমুদ্র, পাহাড় এবং লেকের সঠিক ব্যবহার এখনো নিশ্চিত করা যায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, পোশাক খাত, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স কিংবা কৃষির মতোই পর্যটন হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু তার জন্য দরকার সঠিক গবেষণা।

আমরা কোন দেশের বা কোন শ্রেণির পর্যটককে আকর্ষণ করতে চাই, তাঁদের চাহিদা কী, আর আমরা কী দিচ্ছি-এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত ডেটা বা গবেষণার বড্ড অভাব।

প্রযুক্তির ছোঁয়া ও তরুণদের নতুন দিগন্ত
‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগামীর পর্যটন’-এবারের প্রতিপাদ্যকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে জেলা প্রশাসক জানান, গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে দেশকে চেনাতে ডিজিটাল মাধ্যম ও এআই-এর সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি দেশের তরুণদের পর্যটন উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানান।

তাঁর মতে, সরকার ও প্রশাসনের পাশাপাশি হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক এবং ট্যুর অপারেটরদের সমন্বিত উদ্যোগে এই খাতে বিশাল কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব।

হোটেল কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভিনব উদ্যোগ
চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে এক বাস্তবমুখী ঘোষণা দেন জেলা প্রশাসক। তিনি চট্টগ্রামের হোটেল-রেস্তোরাঁর কর্মীদের তালিকা জেলা প্রশাসনে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

জেলা প্রশাসন থেকে এসব কর্মীদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে এবং একই সাথে পর্যটকদের সঙ্গে বিনয়ী আচরণ, স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা ও উন্নত সেবার বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।পর্যটন

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে সকালে চট্টগ্রাম নগরে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়।

পরবর্তীতে সার্কিট হাউসের এই আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন ট্যুরিস্ট পুলিশ চট্টগ্রাম রিজিয়নের পুলিশ সুপার উত্তম প্রসাদ পাঠক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা যোবাইদা আক্তারসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, ট্যুর অপারেটর ও হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিকরা।

সংশ্লিষ্টদের আশা, কেবল ফাঁকা বুলি নয়, এই পরিকল্পনাগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম কেবল দেশের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি