চরপাথরঘাটা ভূমি অফিসে জহির-শহীদের ঘুষ বাণিজ্য: নামজারির নামে লাখ টাকার ফাঁদ

হয়রানি, হুমকি ও অনিয়মের বালাম: জিম্মি সেবাগ্রহীতারা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৫:১৭

সরকারি বিধি মোতাবেক একটি নামজারি-জমাভাগ (মিউটেশন) খতিয়ান সৃজনের দাপ্তরিক ফি নির্ধারিত মাত্র ১,১৭০ টাকা। অথচ চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী উপজেলার চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সেই সেবা পেতে গুনতে হচ্ছে লাখ টাকা।

ঘুষের টাকা না দিলে বিএস খতিয়ানে ‘ভুল’ ও ‘হিস্যা অমিল’ এর অজুহাত দাঁড় করিয়ে কাজ আটকে রাখা হচ্ছে, দেওয়া হচ্ছে হুমকি।

সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে অর্থ আদায়ের এ চক্রটি গড়ে তুলেছেন ওই ভূমি অফিসের তহসিলদার, কর্ণফুলী উপজেলা ভূমি অফিসের উপ সহকারী কর্মকর্তা মো. জহির রায়হান ও তার অননুমোদিত সহকারী (ক্যাজুয়াল কর্মী) শহীদ।

সম্প্রতি এ চক্রের হয়রানি ও ঘুষ দাবির শিকার হয়ে প্রতিকার চেয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ লোকমান।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি ও তার ভাতিজি শিরিন আক্তারের দুটি পৃথক নামজারি আবেদনের বিপরীতে অনৈতিক অর্থ দাবি, হয়রানি ও হুমকির প্রতিকার চেয়ে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

বিষয়টি জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়কেও অবহিত করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী জানিয়েছেন।

তদন্ত ও ঘুষ দাবির জঘন্য কৌশল :
লিখিত অভিযোগ ও অনুসন্ধানে জানা যায়, ভুক্তভোগী লোকমান গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে দুটি নামজারির আবেদন করেন। নিয়ম অনুযায়ী সরেজমিন পরিদর্শনের নামে তহসিলদার জহির রায়হান জমি মাপজোখ করেন।

তবে পরিদর্শনের পর কাজের অগ্রগতি না হয়ে শুরু হয় টাকার খেলা। তহসিলদারের নির্দেশে সহকারী শহীদ প্রথমে ‘অফিস খরচ’ এর নামে ধাপে ধাপে বিকাশ ও নগদে সর্বমোট ৬ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন, যার ডিজিটাল প্রমাণ (স্ক্রিনশট) ইতিমধ্যে প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

পরবর্তীতে জমির ‘ডিমান্ড’ বা বাজারমূল্য বেশি-এই অজুহাতে দুই মামলার বিপরীতে ৫০ হাজার টাকা করে মোট এক লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন তহসিলদার জহির। সেবাগ্রহীতা এই অনৈতিক দাবির প্রতিবাদ জানালে শুরু হয় দাপ্তরিক কারসাজি।

ভুক্তভোগী লোকমানের অভিযোগ, জমি কেনার আগেই আমি ওই ভূমি অফিসে গিয়ে বালাম দেখে নিশ্চিত হয়েছিলাম। তারা আমাকে খাজনার দাখিলা কেটে দেয়।

দাখিলা দেওয়ার পর জমি রেজিস্ট্রি ও বিএস আবেদনের পর্যায়ে এসে তারা দাবি করছে বিএস খতিয়ানে হিস্যার মিল নেই। তারা নিজেরাই স্বীকার করছে মূল বালামে তাদের অফিস ভুল করেছে, আর সেই ভুলের মাশুল ও সংশোধনের নাম করে এখন লাখ টাকা ঘুষ চাইছে।

টেবিল মানি না দিলে মেলেন না সেবা, ফাঁকা ঘরে লেনদেন :
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ভূমি অফিসে প্রথাগত সরকারি নিয়মের বাইরে গিয়ে তহসিলদার জহির রায়হান ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য শহীদ নামের একজন ক্যাজুয়াল (অস্থায়ী) কর্মীকে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রেখেছেন।

সরকারি বিধি অনুযায়ী যা সম্পূর্ণ অবৈধ। ভূমি অফিসের পেছনের এক ফাঁকা ঘরকে অর্থ লেনদেনের নিরাপদ জোন হিসেবে ব্যবহার করেন এই শহীদ।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী, ঘুষের বকেয়া টাকার জন্য পরবর্তীতে তার স্বজনদের ডেকে পাঠিয়ে ‘সমঝোতা’ করার চাপ দেওয়া হয়। সমঝোতা না করলে কোনোভাবেই বিএস নামজারি দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়।

তহসিলদার জহির প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, আমার টেবিলের টাকা না দেওয়া পর্যন্ত ফাইল পাস হবে না। চেনা জানা দিয়ে পারলে বাংলাদেশ ঘুরে কাজ করিয়ে নেন।

এটি কোনো একক ঘটনা নয়। স্থানীয়দের তথ্য মতে, নামজারি, জমাভাগ ও খাজনা খারিজকে কেন্দ্র করে চরপাথরঘাটা ভূমি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে এই সিন্ডিকেট সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে আসছে।

ভুয়া ওয়ারিশান সনদ দিয়ে নামজারি চেষ্টা বা সঠিক নথিপত্র থাকার পরও খতিয়ান আটকে রেখে টাকা হাতিয়ে নেওয়া এখানকার নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে।

জানা যায়, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে কর্ণফুলী উপজেলা প্রশাসন ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নবনিযুক্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে।

এ বিষয়ে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. রিদওয়ানুল ইসলাম চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিনকে জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য নবনিযুক্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি)’কে লিখিতভাবে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর সত্যতা প্রমাণিত হলে যথাযথ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে কঠোর সুপারিশ পাঠানো হবে।

ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্ত তহসিলদার জহির রায়হানের বক্তব্য নেওয়ার জন্য মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।  সরেজমিনে অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপে কিছু প্রশ্ন রেখে বার্তা পাঠালেও তিনি কোন মন্তব্য করেননি। বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।

এমনকি তার অননুমোদিত সহকারী মো. শহীদও আত্মগোপনে থাকায় তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ভূমিসেবা সহজীকরণের সরকারি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে চরপাথরঘাটা ভূমি অফিসের মতো সংবেদনশীল জায়গায় এমন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দ্রুত অপসারণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া জরুরি, যাতে সাধারণ নাগরিকেরা হয়রানিমুক্ত সরকারি সেবা পেতে পারেন।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি