আনোয়ারা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জুবায়েরের রাজত্বে কোটি টাকার ঘুষ সিন্ডিকেট

অফিসে হয়রানি,দলিল আটকে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:৩৫

কোম্পানির নামে জায়গা রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়েছিলেন এক ব্যক্তি। কাজ শুরুর আগেই সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ঘুষ।

দরকষাকষির পর রফা হয় ৯০ হাজার টাকায়। তাৎক্ষণিকভাবে গুনে দিতে হয় ৮২ হাজার ৫০০ টাকা। বলা হয়, বাকি টাকা দিতে হবে টোকেন ও কার্বন কপি তোলার সময়।

ঘটনাটি আনোয়ারা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের। এটি একদিনের চিত্র নয়, এটিই সেখানকার নিত্যদিনের চিত্র।

অসংখ্য ভুক্তভোগী সেবাপ্রার্থীর অভিযোগ, চট্টগ্রাম জেলার এই কার্যালয়টিতে যেন ওপেন ঘুষের হাট বসেছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চালানো হচ্ছে অনিয়ম ও দুর্নীতির উৎসব।

সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার জুবায়ের হোসেন এই কার্যালয়ে দুবছর আগে যোগদানের পর থেকেই অনিয়মের মাত্রা বহুগুণ বেড়েছে। তার প্রত্যক্ষ মদদে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে প্রতি মাসে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

সীমহীন দুর্নীতির প্রতিবাদে ‘কলম বিরতি’ এর আগে ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর সাব-রেজিস্ট্রার জুবায়ের হোসেনের বেপরোয়া অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতির প্রতিবাদে আনোয়ারা দলিল লেখক সমিতি অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘কলম বিরতি’ পালন করে।

তখন সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম মুন্সি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার জুবায়ের হোসেনের ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়মের কারণে সেবাপ্রার্থী, দলিল লেখক থেকে শুরু করে অফিসের কর্মচারীরা পর্যন্ত অতিষ্ঠ।

সাধারণ মানুষের মুখে মুখে আক্ষেপ-এমন বেপরোয়া সাব-রেজিস্ট্রার আনোয়ারাবাসী আগে কখনো দেখেনি। টাকা ছাড়া কোনো দলিলই তিনি স্পর্শ করেন না।

ইব্রাহিম মুন্সি আরও অভিযোগ করেন, দলিলে নামের সামান্য ভুল থাকলে প্রত্যয়নপত্র দেখানো সত্ত্বেও ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়।

আইনগত বিধান থাকা সত্ত্বেও দানপত্র কিংবা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অজুহাতে মোটা অঙ্কের টাকা না দিলে রেজিস্ট্রি আটকে রাখা হয়।

পাওয়ারের মাধ্যমে দলিল হস্তান্তরের ক্ষেত্রে প্রতিটি পৃথক দলিলে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত দাবি করা নিত্যকার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অবশ্য সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের দুর্ভোগের কথা ভেবে এবং সাব রেজিষ্টার জোবায়ের হোসেনের আশ্বাসে টানা ৮দিন পর ২৭ অক্টোবর কলম বিরতি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

কিন্তু কথায় আছে কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না। সাব-রেজিস্ট্রার জুবায়ের হোসেনের বেলাতেও হয়েছে তাই। পরবর্তীতে ঝাড়ুদার ও পিয়নকে সাথে নিয়ে ভিন্ন কৌশলে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসটিকে জালিয়াতি ও ঘুষের আড়তে পরিণত করেন জুবায়ের।

ঝাড়ুদার যখন ক্যাশিয়ার, ঘুষের সুনির্দিষ্ট বণ্টন
সরকারি বিধান অনুযায়ী রেকর্ডরুমে অননুমোদিত ব্যক্তির প্রবেশ ও অর্থ লেনদেন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও এই কার্যালয়ে চিত্র ভিন্ন। জানা গেছে, অনৈতিকভাবে সংগৃহীত সব ঘুষের টাকা আদায় করে নিজের কাছে রাখেন অফিস পিয়ন মিল্টন পালিত। পরবর্তীতে নির্দিষ্ট হার অনুযায়ী এই অর্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়।

নথি ও প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, আদায়কৃত মোট ঘুষের ৫০ শতাংশ সরাসরি পান সাব-রেজিস্ট্রার জুবায়ের হোসেন। বাকি টাকার ২০ শতাংশ পান কেরানি ও মোহরার, অন্য দুই কর্মচারীর ভাগে যায় ২০ শতাংশ, পিয়ন পান ৫ শতাংশ।

এছাড়া টিসি মোহরার ১ শতাংশ, নৈশপ্রহরী ১ শতাংশ এবং ‘এসএটিএ্যাক্ট’ পদবিধারী ব্যক্তি পান বাকি ৩ শতাংশ টাকা। এমনকি ঘুষের ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে দৈনিক মজুরিভিত্তিক ঝাড়ুদারের বিরুদ্ধে, যাকে দিয়ে জালিয়াতি ও নগদ টাকা তোলার কাজ করানো হয়।

কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য ও নির্দিষ্ট ‘রেট’
অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আনোয়ারা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে সরকার নির্ধারিত ফি পরিশোধের পরও অতিরিক্ত টাকা না দিলে দলিলের কাজ এগোয় না।

নামজারি, খতিয়ান, আইডি কার্ড কিংবা অনলাইনে খাজনার দাখিলা সংক্রান্ত ছোটখাটো ত্রুটি পেলেই সেবাপ্রার্থীদের কাবু করা হয়। ত্রুটি সংশোধনের নামে দলিলপ্রতি ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অনৈতিক সুবিধা আদায় করা হয়।

শুধু তা-ই নয়, জমি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে প্রতি হাজারে ৩ শতাংশ (লাখে ৩ হাজার এবং কোটি টাকার দলিলে ৩০ হাজার টাকা) পর্যন্ত নির্দিষ্ট ‘উৎকোচ’ না দিলে দলিল আটকে রাখা নিয়মিত কৌশলে পরিণত হয়েছে।

এছাড়া সাধারণ দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রেও নির্ধারিত ফি’র বাইরে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়।

একই দিনে একই জমির দুই দলিল:
জুবায়ের হোসেনের কার্যালয়ে জালিয়াতির ভয়াবহ দৃষ্টান্ত মেলে গেল বছলের ১৫ অক্টোবরের একটি ঘটনায়। আনোয়ারা সদর ইউনিয়নের খিলপাড়া মৌজার দেড় কোটি টাকা মূল্যের ১০ শতক জমির মালিকানা নিয়ে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়।

তখন ঝাড়ুদার আবদুল আহাদের মাধ্যমে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে একই দিনে একই জমি দুটি ভিন্ন দলিলের মাধ্যমে নিবন্ধিত করেন সাব-রেজিস্ট্রার জুবায়ের।

ওই দিন জমিটির জন্য প্রথমে একটি ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ (দলিল নং- ৪৪৩৫) এবং পরবর্তীতে একই তারিখে একটি ‘সাব-কবলা’ (দলিল নং- ৪৪৩৭) সম্পাদন করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, একই জমি একই দিনে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি এবং সাব-কবলা হিসেবে নিবন্ধিত করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও চরম জালিয়াতি।

সিসিইউতে মালিক, কার্যালয়ে প্রস্তুত ভুয়া দলিল
শুধু তা-ই নয়, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘নিবন্ধন ম্যানুয়াল-২০১৪’ অনুযায়ী, দলিল পরীক্ষার কাজ অবশ্যই স্বয়ং নিবন্ধকারী কর্মকর্তার (সাব-রেজিস্ট্রার) করার কথা।

কিন্তু আনোয়ারায় সাব-রেজিস্ট্রার জুবায়ের হোসেন তা মানছেন না। তিনি নিজ দায়িত্ব শিকেয় তুলে পিয়ন, উম্মেদার ও নকলনবিশদের দিয়ে স্পর্শকাতর এই কাজ করাচ্ছেন। এই সুসংগঠিত চক্রটির জিম্মিদশা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না সাধারণ জমি ক্রেতা-বিক্রেতারা।

আইন লঙ্ঘন ও অবৈধ সিন্ডিকেট
অভিযোগ রয়েছে, অফিসের পিয়ন মিল্টন পালিতের সহায়তায় একাধিক ভুয়া দলিল তৈরির ঘটনাও ঘটেছে। গত ২৪ আগস্টের একটি ঘটনায় চাতুরী ও বেলচূড়া মৌজার চারটি প্রতারণামূলক দলিল (নং ৩৫৫০, ৩৫৪৬, ৩৫৪৭ ও ৩৫৪৯) সম্পাদন করা হয়।

অথচ দলিলে যে ভূমিমালিকের স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে, সেই আনোয়ারা বেগম গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিসিইউতে (CCU) ভর্তি ছিলেন।

এই জালিয়াতির ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় সাব-রেজিস্ট্রার জুবায়ের ও পিয়ন মিল্টন পালিত এজাহারনামীয় আসামি।

তদারকি নেই, ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা
ভূখণ্ডটিতে ভূমির নিবন্ধন, নামজারি কিংবা শ্রেণি পরিবর্তন সংক্রান্ত যেকাজে সাধারণ মানুষ যাচ্ছেন, সেখানেই শিকার হচ্ছেন হয়রানির।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আনোয়ারা উপজেলার সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত এই সরকারি দপ্তরে প্রতিকার চাওয়ার কোনো জায়গা নেই।

জেলা নিবন্ধক খন্দকার জামিলুর রহমানের কাছে দলিল লেখকরা লিখিত অভিযোগ করলেও কোনো কাজ হয়নি। দৃশ্যত ঊর্ধ্বতন কোনো কর্তৃপক্ষই জুবায়ের হোসেনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে সাব-রেজিস্ট্রার জুবায়ের হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা সংযুক্ত করা হবে।

দুদকের অভিযান চান স্থানীয়রা
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে ঘুষের টাকাসহ অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতেনাতে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।

আনোয়ারার সচেতন নাগরিক ও হয়রানির শিকার ভুক্তভোগীদের দাবি-অবিলম্বে আনোয়ারা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়েও দুদকের সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হোক।

একই সাথে মন্ত্রণালয়ের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জালিয়াতি ও দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আকুল আবেদন জানিয়েছেন তারা।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি