হাইকোর্টে রিট ডিসচার্জ (খারিজ) হওয়ার চার মাস অতিবাহিত হলেও চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের এক লাখ বর্গফুটেরও বেশি আয়তনের দুটি পার্কিং স্থান এখনো সাবেক ইজারাদার মো. শাহ আলমের দখলে রয়ে গেছে।
কোনো ধরনের বৈধ চুক্তি বা আইনি অনুমোদন ছাড়াই প্রকাশ্য দিবালোকে যানবাহন থেকে লাখ লাখ টাকা ফি আদায় করছে সাবেক ইজারাদারের প্রতিষ্ঠান ‘এসএ করপোরেশন’।
রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ব্যবহার করে অবৈধভাবে টাকা তোলার এই নৈরাজ্য চললেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ রহস্যজনকভাবে ‘চোখ বন্ধ’ করে রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আরও পড়ুন
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্টেশন ভবনের পূর্ব ও উত্তর পাশের দুটি পার্কিং এলাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়ম ও অবৈধ অর্থ আত্মসাৎ চলছে।
২০১৭ সালে দুই বছরের জন্য সাবেক ইজারাদার মো. শাহ আলমকে জায়গা দুটি ইজারা দিয়েছিল রেলওয়ে। পরবর্তীতে তা আরও এক বছর নবায়ন করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত মেয়াদের পর নতুন দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নিলে সাবেক ইজারাদার ইজারা নবায়নের দাবিতে হাইকোর্টে রিট করেন।
এর ভিত্তিতে আদালত স্থগিতাদেশ দিয়ে রুল জারি করেছিলেন। তবে গত ২০ মে হাইকোর্ট ওই রুল ডিসচার্জ করে দেন। আইনি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রুল ডিসচার্জের পর ওই জায়গায় ইজারাদারের অবস্থান ও অর্থ আদায় সম্পূর্ণ বেআইনি।
আইনগত কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও গত ২৪ ও ২৭ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পার্কিং দুটি থেকে অবাধে ফি আদায় করছেন এসএ করপোরেশনের কর্মীরা। রসিদ দিয়ে মোটরসাইকেল থেকে ৩০ টাকা, কার ও মাইক্রোবাস থেকে ৫০ টাকা, ছোট কাভার্ড ভ্যান ও মিনিবাস থেকে ১৩০ টাকা এবং বড় কাভার্ড ভ্যান ও বাস থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।
রসিদে আদায়কারীর স্বাক্ষরের পাশাপাশি সরাসরি ‘এসএ করপোরেশন’ নাম ব্যবহার করা হচ্ছে।
দৈনিক অন্তত ২০০ থেকে ৩০০টি যানবাহন সেখানে পার্কিং করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী কেবল হালকা যানবাহন রাখার কথা থাকলেও বাসের মতো ভারী যানবাহনও পার্কিং করিয়ে বাড়তি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আইনি বাধ্যবাধকতা ও আদালতের রায় তোয়াক্কা না করার বিষয়ে জানতে এসএ করপোরেশনের কর্ণধার মো. শাহ আলম ও তার ম্যানেজার সম্রাটের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো সদুত্তর দেননি।
পরবর্তীতে এসএ করপোরেশনের কর্ণধার মো. শাহ আলমের হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে বার্তা পাঠালেও তার কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
তবে পার্কিংয়ের ম্যানেজার ও এসএ করপোরেশনের কর্মী মো. আলাউদ্দিন গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন, তারা আদালতের কোনো আদেশের বিষয়ে জানেন না এবং প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশেই এই ফি আদায় করছেন।
রেলওয়ের প্রধান আইন কর্মকর্তা আল মাহমুদের মতে, আদালত রুল ডিসচার্জ করে দেওয়ার পর সাবেক ইজারাদারের পার্কিং দুটি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ফি আদায় করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। এটি স্পষ্টত বেআইনি। সূত্র-ডি ষ্টার
অথচ আদালতের এই রায়ের পর চার মাস পার হয়ে গেলেও রেলওয়ের পক্ষ থেকে কোনো উচ্ছেদ বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টিতে নিজেদের অনবগত দাবি করে গণমাধ্যমকে জানান, তারা ইজারা পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় ছিলেন এবং সম্প্রতি নতুন দর পাওয়ায় দ্রুত দরপত্র আহ্বান করবেন।
তবে অবৈধভাবে পার্কিং ফি আদায়ের বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের কোনো অনুমতি নেই, কারণ তারা আর বৈধ ইজারাদার নন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি সম্পত্তি দখল করে অবৈধভাবে ফি আদায় করা কেবল চুক্তিভঙ্গই নয়, এটি দণ্ডনীয় অপরাধ ও রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আত্মসাতের সামিল।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতা ও নজরদারির অভাবের কারণে সরকার প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠেছে, চার মাস ধরে চোখের সামনে এমন প্রকাশ্য চাঁদাবাজি ও অবৈধ পার্কিং বাণিজ্য চললেও কেন রেল প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে?
সচেতন মহল মনে করছেন, অবিলম্বে এই অবৈধ দখলদারত্ব উচ্ছেদ করে এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


