ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলওয়ে জংশন এলাকা ও আশপাশে এক ত্রাসের নাম মো. শাহজাহান চৌধুরী (৫০)। তার অপরাধের বিস্তার এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, সাধারণ ব্যবসায়ী, পেশাদার সাংবাদিক কিংবা ইউরোপ প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা-কেউই রেহাই পাচ্ছেন না তার রক্তচক্ষু ও দখলবাণিজ্যের থাবা থেকে।
ইতিপূর্বে মাদকসহ একাধিক মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও অদৃশ্য শক্তির বলয়ে এবং দলীয় প্রভাব খাটিয়ে তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, চালিয়ে যাচ্ছেন চাঁদাবাজি, দখলবাণিজ্য ও হুমকি-ধামকি।
চলতি বছরের ২২ জুন আখাউড়া থানায় বেআইনি জনতাবদ্ধ হয়ে হামলা, পথরোধ, মারামারি, মারাত্মক জখম, হত্যাচেষ্টা, চুরি, ভাঙচুর ও প্রাণনাশের হুমকির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে একটি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে। আখাউড়া থানা মামলা নং-১২। মামলায় পেনাল কোডের ১৪৩/৩৪১/৩২৩/৩২৫/৩২৬/৩০৭/৩৭৯/৪২৭/৫০৬/১১৪ ধারা উল্লেখ রয়েছে।
আখাউড়া উপজেলার রাধানগর (কলেজ রোড) এলাকার বাসিন্দা মো. জালাল উদ্দিন জানু (৬৬) বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেছেন। দায়েরকৃত মামলায় ১৪ জনের নাম উল্লেখ করার পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৮-৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।
অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, প্রথম ঘটনাটি ঘটে ২০ জুন শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে আখাউড়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সড়ক বাজারস্থ ‘রানা স্টিল’ নামক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে। পরবর্তী ঘটনাটি ঘটে ২১ জুন (রবিবার) রাত আনুমানিক ৮:৪০টায় ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নারায়ণপুর বাইপাস রোডে।
মামলা সূত্রে জানা যায়, বিবাদীরা হুকুমদাতার নির্দেশে বেআইনি জনতাবদ্ধ হয়ে পথরোধ করে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত, সাধারণ ও গুরুতর জখম, চুরি, ক্ষতিসাধন এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। এ ঘটনায় আনুমানিক ৪৫ হাজার টাকার মালামাল বা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
মামলায় অভিযুক্ত প্রধান আসামিরা সকলেই আখাউড়া উপজেলার নূরপুর গ্রামের বাসিন্দা। মামলায় যে ১৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়, তারা হলেন-মো. শাহজাহান চৌধুরী (৫০), সৈকত চৌধুরী (২৩), জাহাঙ্গীর মিয়া (৪৫), খোরশেদ (৫৫), স্বপন (৩৫), জামাল চৌধুরী (৫০), আলম (২৬), কালু (৪০), ভাটু (৪২), মাসুদ মিয়া (৩০), মোহাম্মদ আলী (৪০), হাছিম মিয়া (৫০) ও রকিব মিয়া (২৮)। এছাড়াও অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছে আরও ৮/৯ জন।
দৈনিক জনবাণীর প্রতিনিধির ওপর সশস্ত্র হামলা:
সংবাদপত্রের প্রাপ্ত তথ্য ও পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, মাদক পাচার সংক্রান্ত তথ্য ও অপরাধের খবর প্রকাশের জের ধরে ‘দৈনিক জনবাণী’র আখাউড়া প্রতিনিধি মো. ইসমাইল হোসেনের ওপর নৃশংস হামলা চালায় চিহ্নিত মাদক কারবারি শাহজাহান চৌধুরী ও তার গ্যাং।
আখাউড়া থানা রোডের সামনে প্রকাশ্যে নূরপুর গ্রামের মো. শাহজাহান চৌধুরী, জাহাঙ্গীর, জামাল, খোরশেদ মিয়া ও তার ছেলে আলমসহ ২০-৩০ জনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এই হামলা চালায়।
সাংবাদিক ইসমাইল হোসেনের পাশাপাশি সন্ত্রাসী বাহিনীটি স্থানীয় ‘রানা স্টিল’ নামক দোকানেও নির্মম হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ সময় রানা স্টিলের আশরাফুল ইমনসহ একাধিক ব্যক্তি গুরুতর আহত হন।
এই ঘটনায় আখাউড়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হলে থানা পুলিশ তদন্তভার একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে (এসআই) ন্যস্ত করে। থানার ওসি জাবেদ উল ইসলাম অভিযোগ এবং ঘটনা তদন্তের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
রেলওয়ে জংশনে রাজত্ব, আইন ভেঙে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে থাবা:
এখানেই শেষ নয়, সম্প্রতি কয়েকদিন আগে শাহজাহান চৌধুরীর ইশারায় স্থানীয় দখলবাজ ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্যরা মিলে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে এবং প্রবাসীর বৈধ বরাদ্দে বাধা দিয়ে ফের আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। যা নিয়ে ইতিমধ্যে বহু গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে।
জানা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তার কার্যালয় (ঢাকা) থেকে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ইস্যুকৃত স্মারক (নং- ৫৪.০১.২৬৫৪.২০৪.১৮.০৫৩.২৬-১০৯১) অনুযায়ী, আখাউড়া জংশনের ১ নং প্ল্যাটফর্মের উত্তর পাশে ফ্লাইওভার সংলগ্ন খালি জায়গায় (১৫x২০ ফুট=৩০০ বর্গফুট) ক্যান্টিন স্থাপনের বাণিজ্যিক লাইসেন্স পান ফ্রান্সে জাতীয় শহীদ মিনারের আদলে শহীদ মিনার নির্মাণের অন্যতম সংগঠক ও রেমিট্যান্স যোদ্ধা এস এম ইনামুল হক ভূঁইয়া।
২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের যাবতীয় সরকারি খাজনা, ১৫% ভ্যাট ও প্রয়োজনীয় ফি ব্যাংক চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়ার পর স্টেশন মাস্টার, টিআই (সি) শাহজাহান পাটোয়ারী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সরাসরি উপস্থিতিতে অবকাঠামো নির্মাণের স্থান বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু সরকারি এই আদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেন মাদক সম্রাট শাহজাহান চৌধুরী ও তার সহযোগী বিএনপি সমর্থিত সাবেক কমিশনার মনতাজ ও আবুল মনসুর (মিশন) সিন্ডিকেট।
তারা পেশিশক্তি প্রয়োগ করে এবং সাধারণ দোকানদার ও সিএনজি-অটোরিকশা চালকদের বিভ্রান্ত করে সরকারি আদেশের বিরুদ্ধে উল্টো মানববন্ধনের আয়োজন করেন।
অবৈধ পার্কিং ও কোটি টাকার চাঁদাবাজি:
অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের সূত্র ধরে জানা যায়, ১ নং প্ল্যাটফর্ম ও ফ্লাইওভার সংলগ্ন সরকারি স্থানে কোনো বৈধ অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে অর্ধশতাধিক অবৈধ সিএনজি, অটোরিকশা ও টেম্পো স্ট্যান্ড পরিচালিত হচ্ছে।
এর পাশাপাশি গণশৌচাগারের কাছে অস্বাস্থ্যকর নোংরা ঝুপড়ি দোকান বসিয়ে প্রতিদিন অন্তত ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেআইনি চাঁদা আদায় করা হয়।
এই চাঁদাবাজির অর্থ সরাসরি জমা হয় শাহজাহান চৌধুরী ও তার ক্যাডারদের পকেটে। সেখানে বৈধ ও আধুনিক সেবামূলক ক্যান্টিন গড়ে উঠলে অবৈধ স্ট্যান্ড ও ঝুপড়ি দোকান উচ্ছেদ হয়ে যাবে-যার ফলে তাদের বাৎসরিক কোটি টাকার অবৈধ আয়ের পথ বন্ধ হবে।
মূলত নিজেদের পকেট ভারী রাখতেই সরকারি নিয়মে অনুমোদিত কাজে বাধা ও উস্কানি দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় একাধিক ভুক্তভোগী আক্ষেপের সুরে বলেছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় সন্ত্রাসী তাণ্ডব, সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হামলা, ব্যবসায়ীদের মারধর এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি দখলের এক ছত্রাধিপতি হয়ে উঠেছেন নূরপুর গ্রামের মো. শাহজাহান চৌধুরী (৫০)।
একাধিক মাদক মামলার এই এজাহারভুক্ত আসামি সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী নিয়ে একের পর এক অপরাধ সংঘটন করলেও রহস্যজনক কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
যার ফলে সাধারণ ব্যবসায়ী, পেশাদার সাংবাদিক থেকে শুরু করে প্রবাসে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলকারী রেমিট্যান্স যোদ্ধারাও আজ তার রক্তচক্ষু ও সন্ত্রাসী তাণ্ডবের শিকার হচ্ছেন।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন: কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে শাহজাহান?
ভুক্তভোগী প্রবাসী এস এম ইনামুল হক ভূঁইয়ার প্রবীণ পিতা ছিলেন আখাউড়া প্রেসক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও স্বনামধন্য সাংবাদিক। দেশের জন্য রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো এমন সম্মানিত প্রবাসীর পরিবারও আজ অপরাধী চক্রের কাছে জিম্মি।
সাংবাদিকের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা, ব্যবসায়ীদের রানা স্টিলে ভাঙচুর ও আহত করা, একাধিক মাদক মামলা এবং নিয়মিত ফৌজদারি মামলা থাকা সত্ত্বেও কোন অদৃশ্য ক্ষমতার বলে শাহজাহান চৌধুরী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন-তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ ও স্থানীয় সচেতন মহল।
আইনশৃঙ্খলার এমন শিথিলতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন এবং সরকারি সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করছেন-তা নিয়ে আখাউড়াবাসী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সুশীল সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের অভিমত, অবিলম্বে এই চিহ্নিত মাদক সম্রাট, সশস্ত্র হামলাকারী ও চাঁদাবাজ শাহজাহান চৌধুরীসহ তার সঙ্গীদের গ্রেপ্তার এবং উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ করে সরকারের অনুমোদিত ক্যান্টিন নির্মাণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ে মহাপরিচালক, জেলা প্রশাসন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপারের আকুল ও জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হচ্ছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে মো. শাহজাহান চৌধুরীর মুঠোফোনে অনেক চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হলে প্রতিবেদনে তা সংযুক্ত করা হবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


