আখাউড়ায় প্রবাসীর বৈধ প্রকল্পে মাফিয়া চক্রের থাবা: অজ্ঞাত কারণে নিশ্চুপ প্রশাসন!

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৭:২৯

পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম প্রবেশদ্বার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলওয়ে জংশন। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী ও ডজন ডজন দূরপাল্লার ট্রেনের যাতায়াতে মুখরিত এই জংশনে দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে বড় অভাব ছিল একটি স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ খাদ্যের ব্যবস্থা।

স্টেশনের ভেতরে ও আশপাশে খাবারের নামে যা বিক্রি হচ্ছে, তা কেবল অস্বাস্থ্যকরই নয়-অনেক ক্ষেত্রে তা মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

এই চরম ভোগান্তি নিরসনে নিয়ম-কানুন মেনে সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে একটি আধুনিক ক্যান্টিন নির্মাণের বাণিজ্যিক লাইসেন্স নেন ফ্রান্স প্রবাসী ও রেমিট্যান্স যোদ্ধা এস এম ইনামুল হক ভূঁইয়া।

কিন্তু সরকারি যাবতীয় শর্ত পূরণ ও রাজস্ব পরিশোধের পরও সেখানে অবকাঠামো নির্মাণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী, দখলবাজ ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট।

অভিযোগ উঠেছে, সরকারি নির্দেশনা ও নিরাপত্তার উপস্থিতিতে শুরু হওয়া কাজ পেশিশক্তি দেখিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে সাবেক কাউন্সিলর মনতাজ, মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত শাজাহান চৌধুরী ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের একটি চক্র।

নিয়ম-কানুন মেনে বরাদ্দ ও আইনি বাধ্যবাধকতা

বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তার কার্যালয় (ঢাকা) সূত্র ও প্রাপ্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ইস্যুকৃত স্মারক নং- ৫৪.০১.২৬৫৪.২০৪.১৮.০৫৩.২৬-১০৯১ অনুযায়ী, আখাউড়া স্টেশনের ১ নং প্ল্যাটফর্মের উত্তর পাশে ফ্লাইওভার সংলগ্ন খালি জায়গায় (১৫x২০ ফুট=৩০০ বর্গফুট) ক্যান্টিন স্থাপনের জন্য বাণিজ্যিকভাবে লাইসেন্স প্রদান করা হয়।

নীতিমালা অনুযায়ী, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের নির্ধারিত খাজনা, ১৫% ভ্যাট ও যাবতীয় সরকারি ফি ব্যাংক চালানের মাধ্যমে পরিশোধ করেন ভুক্তভোগী ইনামুল হক ভূঁইয়া।

পরবর্তীতে আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার, টিআই (সি) শাহজাহান পাটোয়ারী এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা পুলিশের (এনবিপি) সরাসরি উপস্থিতিতে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী স্থানটি বুঝিয়ে দেওয়া হয় এবং অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

যাত্রী ভোগান্তি ও দখলদারির নেপথ্য কারণ

রেলওয়ে জংশন এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, ১ নং প্ল্যাটফর্ম ও ফ্লাইওভার সংলগ্ন মূল জায়গা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে দখল করে রাখা হয়েছে। গণশৌচাগারের একেবারে লাগোয়া স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে নোংরা ও দুর্গন্ধময় কয়েকটি ঝুপড়ি দোকান।প্রবাসী

এর পাশাপাশি কোনো প্রকার বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই প্রতিদিন অর্ধশতাধিক অবৈধ অটোরিকশা, সিএনজি ও টেম্পো পার্কিং করে যাত্রী চলাচলের পথ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে।

স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব অবৈধ দোকান ও গণপরিবহন স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা চাঁদা ওঠে, যা সরাসরি পকেটস্থ করে স্থানীয় একটি কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল।

নূরপুর এলাকার চিহ্নিত মাদক মামলার আসামি শাজাহান চৌধুরী এবং স্থানীয় বিএনপি সমর্থিত সাবেক কমিশনার মনতাজ ও আবুল মনসুর (মিশন)-এর নির্দেশে এই চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলদারি পরিচালিত হয় বলে ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।

রেলওয়ের বৈধ ক্যান্টিনটি গড়ে উঠলে এই অবৈধ স্ট্যান্ড ও অবৈধ উচ্ছেদ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে এবং তাদের কোটি টাকার চাঁদাবাজির ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে-এই আশঙ্কাতেই চক্রটি মরিয়া হয়ে উঠেছে।

ফ্রান্স প্রবাসী এস এম ইনামুল হক ভূঁইয়ার বক্তব্য:

অত্যন্ত ক্ষোভ ও আক্ষেপের সাথে ইউরোপে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী রেমিট্যান্স যোদ্ধা ভুক্তভোগী প্রবাসী এস এম ইনামুল হক ভূঁইয়া বলেন, আমি ইউরোপের বুকে বাংলাদেশকে মর্যাদার আসনে তুলে ধরতে ফ্রান্সে জাতীয় শহীদ মিনারের আদলে একটি শহীদ মিনার নির্মাণে কার্যকরী সদস্য হিসেবে ভূমিকা রেখেছিলাম, যা আজ সেখানে দৃশ্যমান।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, নিজ মাতৃভূমিতে একটি বৈধ সেবামূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আজ আমাকে নানা প্রতিবন্ধকতা ও অপপ্রচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

আখাউড়া রেলওয়ে জংশনে যাত্রীদের সুবিধার্থে একটি মানসম্মত ক্যান্টিন স্থাপনের জন্য আমি বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাই। কর্তৃপক্ষ সরকারি নীতিমালা মেনে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয় এবং নির্ধারিত সব খাজনা ও সরকারি ফি পরিশোধের পর আমাকে বরাদ্দ প্রদান করে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের যথাযথ কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার, টিআই (সি) শাহজাহান পাটোয়ারী এবং জিআরপি থানার ওসি (কুদ্দুস)-এর উপস্থিতিতে আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্থানটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

অথচ বিগত সরকারের আমল থেকেই আখাউড়া স্টেশনের এই খালি জায়গাটি দখল করে অবৈধ অটোরিকশা, সিএনজি ও টেম্পো স্ট্যান্ড চালানো হতো এবং গণশৌচাগারের পাশে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবারের দোকান পরিচালিত হয়ে আসছিল।

এসব অবৈধ দোকান ও গণপরিবহন স্ট্যান্ড থেকে কতিপয় চিহ্নিত ব্যক্তি ও নেতা প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা অবৈধ বখরা বা চাঁদা পকেটস্থ করত। উল্লেখ্য, ওই স্থানে অটোরিকশা স্ট্যান্ড বা ঝুপড়ি দোকানের কোনো বৈধ অনুমোদন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দেয়নি।প্রবাসী

এখন সেখানে সরকারি নিয়মে অনুমোদিত ও আধুনিক একটি ক্যান্টিন তৈরি হলে অবৈধ পার্কিং এবং বখরাবাজি বন্ধ হয়ে যাবে-এই ভয়ে স্বার্থান্বেষী মহলে চরম অস্বস্তি শুরু হয়েছে। কতিপয় বিএনপি সমর্থিত নেতা ও অবৈধ দখলদারদের পুঁজি করে তারা আমার বৈধ নির্মাণকাজে সরাসরি বাধা সৃষ্টি করছে।

এমনকি মাদক মামলার আসামি শাজাহান চৌধুরীসহ অন্য দখলবাজরা নিজেদের অবৈধ আয়ের পথ সুগম রাখতে লোক ভাড়া করে মিথ্যা ও সাজানো মানববন্ধনের আয়োজন করছে।

সেখানে মাইকিং করে অপপ্রচার চালিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে অসত্য তথ্য পৌঁছানোর পাঁয়তারা করা হচ্ছে, যাতে আমার বৈধ ক্যান্টিনটি সরিয়ে দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী প্রবাসী বলেন, একই এলাকায় শৌচাগারের পাশে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য পরিবেশন ও অবৈধ স্ট্যান্ড নিয়ে যাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই, তারা শুধু নিজেদের দৈনিক ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার চাঁদাবাজির স্বার্থ রক্ষা করতেই আজ একজোট হয়েছে।

সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে শুরু হওয়া কাজে বাধা দেওয়া মানে সরাসরি সরকারের উন্নয়নমূলক পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করা।

একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে মাতৃভূমিতে বিনিয়োগ করতে এসে এমন অবিচার ও হেনস্তার শিকার হওয়া অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। আমি এর সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছি।

সিলেটগামী যাত্রী রফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, আখাউড়া স্টেশনে নামলে মনে হয় ময়লার স্তূপে এসেছি। টয়লেটের পাশেই অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি হয়। যাত্রীদের বাধ্য হয়ে তা খেতে হয়। এখন কোনো প্রবাসী যদি ভালো খাবারের দোকান দিতে চায়, তবে মাস্তানরা তাতে বাধা দিচ্ছে। এদের পেছনে নিশ্চিত বড় কোনো প্রভাবশালী সিন্ডিকেট জড়িত।

সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ জানান, ইনামুল হক ভূঁইয়ার প্রয়াত পিতা ছিলেন আখাউড়া প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন এবং স্বনামধন্য প্রবীণ সাংবাদিক। এমন একটি সম্মানিত পরিবারের সন্তান ও সফল প্রবাসীর বৈধ উদ্যোগে বাধা দেওয়া শুধু ব্যক্তিস্বার্থের ঘাতক নয়, বরং এটি আখাউড়ার ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে।

অবৈধ বাধার বিষয়ে আখাউড়া রেলওয়ে জংশনের নিরাপত্তা পুলিশের কর্মকর্তা মো. রেজাউল স্পষ্ট ভাষায় বলেন, প্রবাসী ইনামুল সরকারি নিয়ম-কানুন মেনে বৈধভাবে বরাদ্দ পেয়েছেন। কিছু অবৈধ দোকানদার ও স্থানীয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী কাজটি বন্ধের পাঁয়তারা করছে। আমরা দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে আইনি শৃঙ্খলা বজায় রাখব।

তবে স্থানীয় জিআরপি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি বেঙ্গল থানার আওতাধীন বলে গণমাধ্যমের কাছে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন।

অপরদিকে আইনশৃঙ্খলার এই শিথিল সুযোগ কাজে লাগিয়ে দুষ্কৃতকারীরা বিভিন্নভাবে মাইকিং করে মিথ্যা অভিযোগ এনে মানববন্ধনের নাটক সাজানোর চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।

রেলওয়ে সংলগ্ন বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ মহলের মতে, সরকারি আদেশ ও বৈধ লাইসেন্স পাওয়ার পরও যদি কোনো বিনিয়োগকারী পেশিশক্তির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন, তবে তা দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহ ও প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সুরক্ষায় চরম ভুল বার্তা দেবে।

অবিলম্বে এই চিহ্নিত চাঁদাবাজ, মাদক মামলার আসামি সাজাহান চৌধুরী ও সাবেক কমিশনার মনতাজসহ পুরো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি গঠন, অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ এবং বৈধ বরাদ্দপ্রাপ্ত ক্যান্টিনটি নিরাপদে গড়ে তোলার জন্য পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ে মহাপরিচালক, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন সাধারণ যাত্রী ও সচেতন নাগরিক সমাজ।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি