জনগণের নিরাপত্তা, সুশাসন, চাঁদাবাজমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, ‘ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে জনগণের যেখানে পারিবারিক পরিচয় বা গোষ্ঠীগত প্রভাবের ভিত্তিতে কেউ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে বসতে পারবে না। যেখানে কোনো চাঁদাবাজি চলবে না।’
সোমবার সন্ধ্যায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
ভাষণে শফিকুর রহমান রাজনৈতিক সংস্কার, মানবাধিকার, অর্থনীতি, বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষা, নারী অধিকার, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং প্রবাসীদের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘তারা এমন বাংলাদেশ গড়তে চান যেখানে রাষ্ট্র হবে সবার এবং সরকার হবে জনগণের সরকার।
শোষণ, জুলুম, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই তাদের লক্ষ্য। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হবে।’
তরুণ সমাজকে দেশের ভবিষ্যৎ শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়েই দেশ গঠনের পরিকল্পনা তাদের।
জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ঐক্যবদ্ধ তরুণ সমাজ দেশের পরিবর্তনের বড় শক্তি হতে পারে। বিভেদ ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে দেশকে মুক্ত করে মানুষের জীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে।’
রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করা এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান জামায়াত আমির।
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে পরিবারতন্ত্র ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল এবং সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।’
ভাষণে অতীত রাজনৈতিক সময়ের সমালোচনা করে তিনি দাবি করেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে মানবাধিকার, ভোটাধিকার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেন এবং এসব সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’
জামায়াত আমির জানান, ‘তাদের নির্বাচনী পরিকল্পনা প্রণয়নে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে।
জনগণের সমর্থনে সরকার গঠন করতে পারলে প্রথম দিন থেকেই এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
নারীর মর্যাদা ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, ‘নারীরা শুধু পরিবার নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের সব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পাবে।
রাজনীতি, প্রশাসন, কর্পোরেট খাতসহ সব জায়গায় নারীর মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করবে জামায়াত।’
বাংলাদেশকে সব ধর্মের মানুষের দেশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য বা সহিংসতা বরদাশত করা হবে না। সবাই যেন নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারে এমন সমাজ গড়া হবে।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘শিক্ষা খাতে নৈতিকতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করা হবে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি তাদের প্রধান লক্ষ্য।
বেকার ভাতার পরিবর্তে দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে তরুণদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে চান তারা।’
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগের সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। একই সঙ্গে ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে ব্যাংকিং খাতসহ প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক খাতে সংস্কারের কথা বলেন।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপরও জোর দেন তিনি।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমমর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন শফিকুর রহমান। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেন।
পাশাপাশি প্রবাসীদের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন এবং সংসদে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন জামায়াত আমির।
সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনকে রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিক দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার আহ্বান জানান।
প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসাও করেন তিনি।
ভাষণের শেষ অংশে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনাকে ‘আমানত’ হিসেবে উল্লেখ করে দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব দেন।
একই সঙ্গে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জামায়াত ও জোট প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
নতুন বাংলাদেশ গঠনে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে যেখানে সবাই মর্যাদা, সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করতে পারবে।’


