চট্টগ্রাম নগরের স্টেশন রোডে কয়েক দিন ধরে যেন এক অদ্ভুত দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। কেউ মোটরসাইকেল থামিয়ে জিজ্ঞেস করছেন, “ভাই, ওই ৫ টাকার কাঁঠাল কোথায়?”
কেউ আবার মোবাইলের স্ক্রিন সামনে ধরে বলছেন, “এই যে ভিডিওতে দেখলাম!” আর বিক্রেতারা একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে মুচকি হাসছেন।
কাঁঠালের বাজারে এমন দৃশ্য সাধারণত দেখা যায় না। কাঁঠাল কিনতে এসে মানুষ সাধারণত গন্ধ শুঁকে, আকার দেখে বা কোয়া মিষ্টি হবে কি না তা নিয়ে আলোচনা করেন।
কিন্তু এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটাই—‘৫ টাকার কাঁঠাল’!
মনে হচ্ছে যেন শহরের কোথাও কোনো গুপ্তধনের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। আর সেই গুপ্তধনের সন্ধানেই প্রতিদিন ভিড় করছেন অসংখ্য মানুষ।
তবে কাছে গিয়ে তাঁদের অনেকেরই মনে হচ্ছে, যেন সিনেমার শেষ দৃশ্যে এসে জানা গেল গল্পটা আসলে অন্য রকম।
ঘটনার শুরু একটি ভাইরাল ভিডিওকে ঘিরে। ভিডিওতে দেখা যায়, স্টেশন রোডের ফলের আড়তে সারি সারি কাঁঠালের পাশে বসে আছেন বিক্রেতা মোহাম্মদ মাসুদ।
হাতে কাঁঠাল তুলে তিনি বলছেন, প্রতিটির দাম মাত্র পাঁচ টাকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় আলোচনা, বিস্ময় আর কৌতূহল।
কেউ বিশ্বাস করতে পারেননি। কেউ আবার বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন একেবারে শতভাগ। আর সেই বিশ্বাস নিয়েই অনেকে ছুটে এসেছেন স্টেশন রোডে।
তেমনই একজন নিলয় দাশ। নগরীর মোমিন রোড এলাকার কদম মোবারক গলির বাসিন্দা এ চাকরীজিবী এসেছিলেন সস্তা কাঁঠালের আশায়।
মনে মনে হয়তো হিসাবও কষে ফেলেছিলেন—এক ডজন কাঁঠাল কিনলেও খরচ হবে খুব সামান্য। কিন্তু বাস্তব বাজারে এসে তাঁর সামনে হাজির হলো অন্য চিত্র।
পাঁচ টাকার কাঁঠাল নেই। একশ টাকারও নেই। বরং ছোট কাঁঠালের দাম ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, মাঝারি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, আর বড় কাঁঠাল ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
নিলয় দাশের বিস্ময় তখন অনেকটা সেই ছাত্রের মতো, যে পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখে প্রশ্নপত্র আর গাইডবইয়ের প্রশ্ন এক নয়।
তিনি বলেন, “ভিডিও দেখে ভেবেছিলাম কাঁঠালের দাম অনেক কমে গেছে। এখানে এসে দেখি, ঘটনা পুরো উল্টো।”
তবে ঘটনাটির আরেকটি দিকও আছে। যাঁকে ঘিরে এত আলোচনা, সেই মোহাম্মদ মাসুদ বলছেন, তিনি কোনো মিথ্যা বলেননি। সত্যিই তিনি পাঁচ টাকায় কাঁঠাল বিক্রি করেছিলেন। তবে সেটা বর্তমান সময়ের ঘটনা নয়।
ঈদুল আজহার ছুটির সময় স্টেশন রোডের বাজারে যেন নেমে এসেছিল নীরবতা। শহরের নিম্ন ও স্বল্প আয়ের অনেক মানুষ গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। যাঁরা সাধারণত এই আড়ত থেকে কাঁঠাল ও আনারস কিনতেন, তাঁদের বড় অংশই তখন শহরে ছিলেন না।
অন্যদিকে কাঁঠাল কিন্তু মানুষের ছুটির ক্যালেন্ডার দেখে পাকে না। দিন গড়িয়েছে, ফল পেকেছে, স্তূপ বড় হয়েছে; কিন্তু ক্রেতা আসেননি।
মোহাম্মদ মাসুদের ভাষায়, “ঈদের সময় কাঁঠালের বেচাকেনা মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। মানুষ তখন মাংস নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কাঁঠাল কেউ কিনছিল না।”
ফলে একসময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যখন কাঁঠাল বিক্রি না হলে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়াই ছিল নিয়তি। আর তখনই লোকসান মেনে পাঁচ টাকায় বিক্রি শুরু করেন তিনি।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যে কাঁঠাল তখন কেউ কিনতে চাইছিল না, সেই কাঁঠালই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তারকা।
মাসুদ জানান, ওই সময় প্রায় ৬০ হাজার টাকার লোকসান গুনতে হয়েছে তাঁকে।
কথা বলতে বলতে তিনি পাশের একটি স্তূপের দিকে ইশারা করেন। সেখানে এখনও পড়ে আছে অনেক কাঁঠাল। কিছু কালচে হয়ে গেছে, কিছু ফেটে গেছে, কিছু পচেও নষ্ট হয়েছে। সময়মতো ক্রেতা না পাওয়ার মূল্য তাদেরও দিতে হয়েছে।
স্টেশন রোডের পুরোনো রেলওয়ে স্টেশনের পাশে সারি সারি ফলের আড়ত। এখানে কাঁঠাল, আনারস আর কলার স্তূপের মাঝেই দিন কাটান ছোট ব্যবসায়ীরা। অধিকাংশ ক্রেতা পথচারী কিংবা ভ্যানে ঘুরে ফল বিক্রি করা খুচরা বিক্রেতা।
ঈদের ছুটিতে যখন মানুষ কমে গিয়েছিল, তখন বাজার প্রায় ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে। আর এখন ছুটি শেষ হওয়ার পর, বৃষ্টি ও বাড়তি চাহিদার কারণে বাজার আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
ফলে যে কাঁঠাল একসময় পাঁচ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, সেটিই এখন ১৫০ থেকে ৩০০ টাকার বাজারে জায়গা করে নিয়েছে।
স্টেশন রোডের কয়েকজন ব্যবসায়ীও একই কথা বললেন। তাঁদের মতে, বর্তমানে ভালো মানের কাঁঠালের চাহিদা রয়েছে এবং ক্রেতাও বেড়েছে। তাই দামও আগের তুলনায় স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী হোসেন জানান, বাজারে কাঁঠালের কোনো সংকট নেই। সরবরাহও রয়েছে, চাহিদাও রয়েছে। দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই আছে।
তবে পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত অন্য জায়গায়।
ডিজিটাল যুগে একটি ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
কিন্তু ভিডিওটি কবে ধারণ করা হয়েছে, কোন পরিস্থিতিতে করা হয়েছে কিংবা সেটি এখনও প্রাসঙ্গিক কি না—এসব তথ্য অনেক সময় হারিয়ে যায় ‘শেয়ার’ আর ‘ভিউ’-এর ভিড়ে।
ফলে একটি পুরোনো ভিডিও নতুন বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। মানুষ তথ্যের চেয়ে শিরোনামে বেশি বিশ্বাস করতে শুরু করে।
স্টেশন রোডের ‘৫ টাকার কাঁঠাল’ তাই শুধু একটি ফলের বাজারের গল্প নয়। এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্বেরও গল্প।
কারণ বাস্তবতা হলো—পাঁচ টাকার কাঁঠাল একসময় সত্যিই ছিল। কিন্তু সেই কাঁঠাল এখন অনেকটাই গল্পের চরিত্র।
আর সেই গল্পের পেছনে ছুটে আসা মানুষদের জন্য স্টেশন রোড আজও নীরবে যেন একই কথা বলে চলেছে— “ভিডিওটা আগে দেখবেন, কিন্তু তারিখটাও একবার দেখে নেবেন!”
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

