আমার অনেক কিছু বলার আছে-প্রিজন ভ্যানে চিৎকার ডেভিড ইমনের

বেশভূষা বদলেও শেষ রক্ষা হয়নি

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬ ১৭:০৮

আদালতের নিরাপত্তা বেষ্টনী চিরে ভেসে আসা একটা মাত্র বাক্য! আর তাতেই চট্টগ্রাম জুড়ে তৈরি হয়েছে ঘোর রহস্যের কুয়াশা।

ছদ্মবেশে ভারত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালানো শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের সেই অসমাপ্ত চিৎকার এখন বন্দরনগরীর আলোচনার এক নম্বর টপিক।

প্রিজন ভ্যানের কড়া প্রহরার মধ্যেও মুখ খোলার এই আকুলতার নেপথ্যে কি তবে কোনো প্রভাবশালী গডফাদার বা পর্দার আড়ালের পৃষ্ঠপোষকদের তথ্য আড়াল করার চেষ্টা কাজ করছে?

অসমাপ্ত জবানবন্দি ও প্রিজন ভ্যানের নাটকীয়তা

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ কার্যালয় থেকে প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় চারপাশের থমথমে পরিবেশ একমুহূর্তে বদলে যায়। নিরাপত্তা বলয়ের ভেতর থেকেই সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে চিৎকার করে ওঠেন ডেভিড ইমন-আমার অনেক কিছু বলার আছে।

কথাটি শেষ করার আগেই তাকে দ্রুত ঠেলে ভানের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, ভারী লোহার দরজা বন্ধ হয়ে যায় শব্দ করে। কিন্তু তার মুখের সেই সংক্ষিপ্ত আকুতি রেখে গেছে একাধিক তোলপাড় করা প্রশ্ন, কী এমন গোপন সত্য তিনি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন?

অপরাধ জগতের এই ‘ডানহাত’ কি তবে এবার আসল ‘মাথার’ নাম প্রকাশ করে দিতে চেয়েছিলেন? কারা চেয়েছিল তার মুখ চিরতরে বন্ধ রাখতে?

রূপ পরিবর্তন ও পালিয়ে যাওয়ার ব্যর্থ নীল নকশা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়াটা ইমনের জন্য নতুন কিছু ছিল না। তবে এবার তিনি যে ছক কষেছিলেন, তা ছিল থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানানোর মতো।

নিজের সুপরিচিত গোঁফ ছেঁটে ফেলে, বেশভূষা বদলে একেবারে সাধারণ পথচারীর বেশ ধরেছিলেন। লক্ষ্য ছিল-যশোরের বেনাপোল সীমান্ত ব্যবহার করে ভারতে গা ঢাকা দেওয়া।

কিন্তু গোয়েন্দা তথ্যের শক্ত জালের সামনে ভেস্তে যায় তার সব আয়োজন।

বুধবার (২৯ জুলাই) ভোরে যশোর ও চট্টগ্রাম পুলিশের যৌথ টিম যখন যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকার চেকপোস্টে একটি প্রাইভেটকার থামায়, তখনই ধরা পড়ে যান তিনি। গোঁফ ছাড়া নতুন চেহারাতেও শেষ রক্ষা হয়নি এই দুর্ধর্ষ অপরাধীর।

নেপথ্যের গডফাদার ও অপরাধ সাম্রাজ্যের কালো অধ্যায়

বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের আরেক ভয়ংকর শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’ এর প্রধান সহযোগী এই ডেভিড ইমন। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে একচ্ছত্র রাজত্ব চালিয়ে আসছিলেন তিনি।

এক নজরে ডেভিড ইমনের অপরাধের চিত্রপট:

অপরাধের ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও মামলার ধরন
চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড বাকলিয়ার আলোচিত জোড়া খুন এবং পতেঙ্গায় ঢাকাইয়া আকবর হত্যা।
সাম্প্রতিক তাণ্ডব নগরীর বিভিন্ন ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর ও ত্রাস সৃষ্টি।
চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের কাছ থেকে কোটি টাকার চাঁদা দাবি ও প্রাণনাশের হুমকি।
মোট মামলা অন্তত ১১টিরও বেশি হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট মামলা।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশে থাকা বড় সাজ্জাদের নির্দেশে মাঠপর্যায়ে ডেভিড ইমনই এসব কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করতেন। এখন প্রশ্ন উঠছে, ইমনের পেছনে কি কোনো স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের আশ্রয় ছিল, যাদের মুখোশ উন্মোচিত হওয়ার ভয়ে তিনি প্রিজন ভ্যানে কথা বলতে চেয়েছিলেন?

আদালতে সোপর্দ করার পর থেকেই ডেভিড ইমনকে ঘিরে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাকে রিমান্ডে এনে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

তবে প্রিজন ভ্যানের দরজার ওপাশ থেকে আসা ইমনের সেই চিৎকার চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়ায়নি।

চট্টগ্রামের সচেতন মহল মনে করছেন, রিমান্ডের টেবিলেই প্রকাশ পেতে পারে ইমনের সেই ‘অনেক কিছু বলার আছে’ র আসল রহস্য।

এখন দেখার বিষয়-আইনি প্রক্রিয়ার এই মুখোমুখি লড়াইয়ে চট্টগ্রাম অপরাধ জগতের আরও কোন কোন রথী-মহারথীর মুখোশ উন্মোচিত হয়!

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি