হৃদরোগীদের জীবন নিয়ে ডাক্তার-নার্স সিন্ডিকেটের ভয়ংকর বাণিজ্য!

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬ ১৭:০৯

যে যন্ত্রটি রোগীর স্তব্ধ হতে যাওয়া হৃদপিণ্ডকে সচল করার কথা, ডাক্তার-নার্স সিন্ডিকেটের এক নির্দয় ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশে সেটিই হয়ে উঠছে এখন মরণফাঁদ।

প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে অবৈধভাবে সীমান্ত ডিঙ্গিয়ে আনা রিং (স্টেন্ট), বেলুন ক্যাথেটার, গাইড ওয়্যার, গাইড ক্যাথেটার, ওয়াই-কানেক্টর, ম্যানিফোলড ও শিথ টাইগার ক্যাথেটার অবাধে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে রোগীদের শরীরে।

হৃদরোগ চিকিৎসার এই অতি সংবেদনশীল উপকরণের নিয়ন্ত্রণ এখন এক অসাধু চোরাচালান সিন্ডিকেটের হাতে, যাদের পেছনে শক্ত ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দেশের নামিদামি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্সরা।

রাজধানীতে প্রশাসনিক কড়াকড়ি শুরু হওয়ায় এই সিন্ডিকেট সম্প্রতি তাদের অপরাধের মূল ঘাটি বানিয়েছে চট্টগ্রামকে।

সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার পাশাপাশি জীবন রক্ষাকারী ডিভাইসের নির্ধারিত তাপমাত্রা বা ‘কোল্ড চেইন’ ভেঙে আনা এসব উপাদান ব্যবহারে হাজার হাজার রোগী চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।

হৃদরোগ সরঞ্জামের জালিয়াতি: মাসুদের ‘ছায়া সাম্রাজ্য’

এই বিস্তৃত অবৈধ বাণিজ্যের মূল কারিগর মাসুদুর রহমান। দৃশ্যমান পরিচয়ে তিনি হৃদরোগের রিং আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান দ্য স্পন্দন লিমিটেড এবং বিশ্বখ্যাত কোম্পানি বোস্টন সায়েন্টিফিক এর সাব-ডিস্ট্রিবিউটর।

তবে এ পরিচয়ের আড়ালে তিনি গড়ে তুলেছেন বেনামি নেটওয়ার্ক। ঔষধ প্রশাসনের কোনো অনুমোদন না থাকলেও মাসুদ তিনটি নিজস্ব প্রতিষ্ঠান খুলে এই চোরাই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এর মধ্যে একটি হলো রিদম মেডিকেল ইন্টারন্যাশনাল। অপর দুটির মধ্যে রয়েছে ভারটেক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও থ্রিএফ ইন্টারন্যাশনাল।

এছাড়াও তাঁর ছায়াতলে পরিচালিত হচ্ছে মেডি গ্রাফিক, স্পেস মেড এন্টারপ্রাইজ, প্রবর্তন সিস্টেমস লিমিটেড এবং মেরিল লাইফ সায়েন্স নামে আরও চারটি বেনামি প্রতিষ্ঠান।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। কাগজে-কলমে ভারটেক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে সচল দেখালেও বাস্তবে এই প্রতিষ্ঠানের কোনো ভৌত অফিস বা অস্তিত্বই নেই।

এই ভুয়া ও অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে মাসুদ সরঞ্জাম সরবরাহ করছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল, বন্দরনগরীর পার্কভিউ হাসপাতাল, সিএসসিআর হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, এভারকেয়ার হাসপাতাল, ম্যাক্স হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল সেন্টার, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল এবং অ্যাপোলো ইমপেরিয়ালের মতো নামিদামি চিকিৎসাকেন্দ্রে।

অন্ধকারে রোগী, পকেটে ১৫ থেকে ২০ হাজারের ‘রক্তচোষা’ কমিশন

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ঔষধ প্রশাসনের নিয়মানুযায়ী, অস্ত্রোপচারের পর ব্যবহৃত রিংয়ের সুনির্দিষ্ট প্যাকেজিং, ব্যাচ নম্বর ও মোড়ক রোগীর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা বাধ্যতামূলক, যাতে তারা নিশ্চিত হতে পারেন রোগীর শরীরে কী মানের পণ্য লাগানো হয়েছে। কিন্তু এই সিন্ডিকেটের মূল কৌশলই হলো তথ্য গোপন রাখা।

জাতীয় একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের হাতে আসা অন্তত ৫০ জন রোগীর নথিতে দেখা গেছে, অপারেশনের পর রোগীদের পণ্যের প্যাকেট তো দূরের কথা, কোনো বিস্তারিত তথ্যই জানানো হয়নি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিটি স্টেন্ট ব্যবহারের বিপরীতে চিকিৎসকদের জন্য ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন বরাদ্দ রাখা হয়।

বিশেষ করে কিছু ইউরোপীয় বা কোরিয়ান ব্র্যান্ডে চিকিৎসকদের ঝোঁক বেশি। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশ্বমানের ডিভাইসে কমিশন কম হওয়ায় সেগুলোর ব্যবহার পরিকল্পিতভাবে কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

চমেকের ১২ নম্বর ওয়ার্ড: ক্যাথল্যাব যখন নার্সদের দখলে

চট্টগ্রামের কোটি মানুষের ভরসাস্থল চমেক হাসপাতালের তিনটি ক্যাথল্যাবের মধ্যে রহস্যজনক কারণে দুটি ক্যাথল্যাব দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে।

আর সচল থাকা ১২ নম্বর ওয়ার্ডের একমাত্র ক্যাথল্যাবটি জিম্মি হয়ে পড়েছে সিনিয়র স্টাফ নার্স ও নার্সিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন আকন্দ এবং খোকন কান্তি বিশ্বাস এর কাছে।

সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। রোগীদের দেহে কোন কোম্পানির রিং বা ক্যাথেটার লাগানো হবে, তা নির্ধারণ করেন এই দুই নার্স।

বিনামূল্যে সেবার সরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার কক্ষ (ওটি) চার্জ বাবদ প্রতিটি কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধির কাছ থেকে তারা জবরদস্তিমূলকভাবে ৫ হাজার টাকা আদায় করেন।

বিগত তিন বছরে পাঁচবার বিদেশ ভ্রমণ করা নার্স আনোয়ার হোসেন এই ভ্রমণকে প্রশিক্ষণ বললেও ক্যাথল্যাব জিম্মি করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে আরেক নার্স খোকন কান্তি বিশ্বাস মুখ খুলতেই রাজি হননি।

চিকিৎসকদের স্বজনপ্রীতি ও লাইসেন্সহীন বাণিজ্যের প্রমাণ

এই অবৈধ চক্রে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান থেকে শুরু করে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের নাম। চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরীর ভাতিজা ফায়েজ চৌধুরী ‘কার্ডিওকিট’ নামের এক প্রতিষ্ঠান খুলে এই অবৈধ পণ্যের জোগান দিচ্ছেন।

ফায়েজ চৌধুরী নিজে স্বীকার করেছেন, তিনি মাসুদের অবৈধ প্রতিষ্ঠান ‘রিদম মেডিকেল’ থেকে সরঞ্জাম নিয়ে চমেকের ক্যাথল্যাবে সরবরাহ করেন। নথিপত্র দেখানোর পর অধ্যাপক ডা. ইব্রাহিম চৌধুরী কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

চমেকের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইকবাল মাহমুদ ‘মেডি সায়েন্স টেকনোলজি’ নামের এক বেনামি কোম্পানির মাধ্যমে পার্কভিউ হাসপাতালে চোরাই রিং ও সরঞ্জাম সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক মামুন কবীর ভূঁইয়া লাইসেন্স না থাকার কথা স্বীকার করলেও ডা. ইকবাল নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে দাবি করেন, তারা শুধু অনুমোদিত পণ্যের ওপর নির্ভর করেন।

তবে গত ছয় মাসে পার্কভিউ হাসপাতালে ব্যবহৃত রিংগুলোর ভ্যাট বা কর পরিশোধের কোনো রাজস্ব নথি পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের মুখোমুখি হয়ে অভিযুক্ত মূল হোতা মাসুদুর রহমান প্রথমে গণমাধ্যমকে বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নেই, আমি কেবল দ্য স্পন্দন লিমিটেডের সাব-ডিস্ট্রিবিউটর। তবে তাঁর নিজস্ব বেনামি কোম্পানির দালিলিক প্রমান উপস্থাপনের পর তিনি কথা বলা বন্ধ করে দেন।

আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান দ্য স্পন্দন লিমিটেড এর পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, আমাদের নিবন্ধিত হৃদরোগ সরঞ্জাম অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের প্যাডে বিক্রি করার সুযোগ নেই। সূত্র-সমকাল

২০২৩ সালে নিম্নমানের উপকরণ রাখার কারণে আমাদের প্রতিষ্ঠান জরিমানা ও বন্ধ করা হয়েছিল। আমরা শুধু ব্যবসা করি, এর বাইরে কিছু জানি না।

অন্যদিকে চমেকের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আনিসুল আউয়াল, ডা. আশীষ দে ও ডা. কাজী শামীম আল মামুন দাবি করেন, সরঞ্জাম নির্ধারণের বিষয়টি টেকনিশিয়ান বা স্বজনদের বাজেটের ওপর নির্ভর করে।

তবে আবাসিক চিকিৎসক সাইফুদ্দিন সোহাগ নিশ্চিত করেন, বিভাগে সরঞ্জাম তদারকির জন্য ডা. ইব্রাহিম চৌধুরীর নেতৃত্বেই চার সদস্যের কমিটি রয়েছে-যা পুরো প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে।

‘কোল্ড চেইন’ ধ্বংস: হৃদপিণ্ডে অকেজো রিং ও চরম মৃত্যুর ঝুঁকি

সংবেদনশীল চিকিৎসা সরঞ্জাম চোরাচালানে কেবল রাজস্বই চুরি হচ্ছে না, তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি মেডিকেল ডিভাইস একটি সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রায় (কোল্ড চেইন) সংরক্ষণ ও পরিবহন করতে হয়। চোরাইপথে ব্যাগ বা লাগেজে করে আসায় আন্তর্জাতিক এই মানদণ্ড বজায় থাকে না।

তাপমাত্রার ভারসাম্য হারালে রিং বা ক্যাথেটারগুলো মানবদেহে কার্যকর ক্ষমতা হারায়, যা বসানোর পরপরই ধমনীতে রক্ত জমাট বেঁধে রোগীর আকস্মিক মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহা. আলমগীর হোসেন কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অসাধু চিকিৎসক ও ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে চোরাইপথে রিং আসার তথ্য আমরা পেয়েছি।

নিবন্ধন ছাড়া কোনো মেডিকেল ডিভাইস আমদানির সুযোগ নেই। তদন্তে প্রমান মিললে অভিযুক্ত প্রতিটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চিকিৎসাসেবা যখন স্রেফ কমিশনে বিক্রি হয়, আর জীবন রক্ষাকারী ক্যাথল্যাব যখন সিন্ডিকেটের জিম্মিদশায় আবদ্ধ থাকে, তখন সাধারণ মানুষের চিকিৎসাস্থল পরিণত হয় মরণফাঁদে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক পদক্ষেপই পারে এই ভয়ংকর অসাধু চক্রটির মূলোৎপাটন করতে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি