একসময় যাঁর বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ লেগ স্পিনের ভেলকিতে মুগ্ধ হতেন কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়ামের কোচেরা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক তারকাদের নেট সেশনে যাঁর বোলিংয়ে ভবিষ্যৎ দেখতেন ক্রীড়াবোদ্ধারা-সেই প্রতিশ্রুতিশীল তরুণই কয়েক বছরের ব্যবধানে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের আতঙ্কের এক প্রতীক।
বাঁহাতে ক্রিকেট বল সুইং করানোর বদলে তাঁর আঙুল উঠে আসে ট্রিগারে, হাতে স্থান পায় থানা থেকে লুট হওয়া আধুনিক মারণাস্ত্র।
বলছিলাম মোবারক হোসেন ওরফে ‘ডেভিড ইমন’-এর কথা। গত ১৩ জুন চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে সংঘটিত বহুল আলোচিত মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে এই শুটারের ত্রাসসাম্রাজ্যের মূল শেকড় খুঁজে পেয়েছে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
পাহাড়তলীর রক্তপাতের সূত্র ধরে যশোর সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ডেভিড ইমনসহ তাঁর বাহিনীর চার সহযোগীকে। গ্রেপ্তার হওয়া অন্যরা হলেন-মো. শামীম (২৮), মো. মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াছ (৪৯), আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল (২৫) এবং মো. সাফায়েত হোসেন (২৪)।
এরপর তাঁদের দেওয়া তথ্যে ফটিকছড়ির নিঝুম টিলায় পরিত্যক্ত বাড়িতে মিলেছে পিস্তল, এলজি ও দেশীয় অস্ত্রের এক গোপন গুদাম। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি এবং একাধিক দেশীয় ধারালো অস্ত্র।
গ্রেপ্তার অভিযান সম্পর্কে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকালে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন গ্যাংয়ের মূল নেতৃত্বে রয়েছে বড় সাজ্জাদ। তার প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করতো ডেভিড ইমন। এছাড়া গ্যাংটির আরেক সদস্য রায়হান দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে থাকা মামলার তথ্য তুলে ধরেন এসপি মাসুদ আলম বলেন, পুলিশের সিডিএমএস তথ্য অনুযায়ী ইমনের বিরুদ্ধে বর্তমানে ১৩টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি হত্যা মামলা এবং বাকি মামলাগুলো চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে ফটিকছড়ি থানায় মামলা করা হয়েছে। এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে। পুরাতন ফটিকছড়ি থানার মামলায় রিমান্ড আবেদন করা হবে।
যশোর থেকে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে এসপি বলেন, পুলিশের কাছে আগে থেকেই কিছু গোয়েন্দা তথ্য ও অন্যান্য আলামত ছিল। সেগুলোর ভিত্তিতেই তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি নিজের চেহারা পরিবর্তন করেছিলেন। এমনকি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চুল-দাড়ির
স্টাইলও পরিবর্তন করেন।
দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং নিরলস পরিশ্রমের ফলেই এই সফল অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছে। জেলা পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে নতুন মামলা রুজুর প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে এই সন্ত্রাসী চক্রের পেছনের ইন্ধনদাতা, অর্থের জোগানদাতা এবং চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
রাউজানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে এসপি মাসুদ আলম বলেন, চট্টগ্রামে যোগদানের পর দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে-জঙ্গল সলিমপুর এবং রাউজান। শুরু থেকেই রাউজানকে ঘিরে একটি বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে পুলিশ কাজ করছে এবং ভবিষ্যতেও সেই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
‘বড়লোক’ হওয়ার ভয়ঙ্কর বাসনা
রহমানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হলেও পড়াশোনা এগোয়নি ইমনের। ২০২০ সালে করোনা মহামারীর স্থবিরতার সময় তিনি পুরোপুরি ঝুঁকে পড়েন রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের দিকে। পরবর্তীতে ওমান গিয়ে এক বছর পর ফিরে এসে অপরাধজগতে স্থায়ী আসন গাড়ার পরিকল্পনা করেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর নগরের বায়েজীদ বোস্তামীর আতুরার ডিপো এলাকাকে আস্তানা বানান ইমন। সেখানে অক্সিজেন এলাকার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র মহড়া ও সংঘাতের মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’ এর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে লুটের ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ইমনের একটি ছবি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বড় সাজ্জাদের ছায়াতলে থেকে রাতারাতি গড়ে তোলেন অন্তত ৫০ জন শুটারের এক হিংস্র নেটওয়ার্ক।
মুঠোফোনে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে সন্ত্রাসের পথ বেছে নেওয়ার যে ব্যাখ্যা ইমন দিয়েছিলেন, তা যেকোনো সভ্য সমাজের ভিত্তি নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বলেছে, আমার ছোটবেলা থেকে ইচ্ছা ছিল বড় ক্রিকেটার হব, না হয় বড়লোক হব। বড়লোক হওয়ার জন্য এই পথে আছি।
এই এক বিকৃত ও ভয়ঙ্কর বাসনাই একজন সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদকে রূপান্তর করে এক ক্ষমতাহীন নির্দয় কিলারে। বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের কাছে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা ছিল তাঁর নিয়মিত কাজ।
নগরীর এক শ্রমিক নেতাকে ফোনে তাঁর হুমকি ছিল-৫০ হাজার পুলিশ নিয়ে থাকলেও ঘরে গিয়ে মেরে ফেলব। তোর ভাইকে যেমন ১০ হাজার মানুষের মাঝখানে গুলি করে মেরেছি, তোকেও সেভাবে মারব।
চাঁদা না পেয়ে গত ১৩ জুলাই বাকলিয়া অ্যাকসেস রোডে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে চালানো রক্তক্ষয়ী তাণ্ডব প্রমাণ করে, কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল তাঁর গ্যাং।
২২ দিনের জামিন ও রক্তে লেখা অপরাধের খতিয়ান
আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অদূরদর্শিতা এবং আইনি ফাঁকফোকরের সুবিধা কীভাবে একজন অপরাধীকে দানবে রূপান্তর করে, তার বড় প্রমাণ ইমনের মামলা পঞ্জিকা।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বায়েজীদ থানার একটি দস্যুতার মামলায় কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ইমন। কিন্তু অলৌকিকভাবে মাত্র ২২ দিনের মাথায় জামিনে মুক্তি পান তিনি।
জামিন পাওয়ার পরপরই চট্টগ্রামজুড়ে শুরু হয় তাঁর নির্মম রক্তের হোলিখেলা। গেল বছরের ৩০ মার্চ বাকলিয়ার চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের মাস্টারমাইন্ড ও সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন।
ওই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে পিনপতন নীরবতার মধ্যে খুন করা হয় সন্ত্রাসী ‘ঢাকাইয়া আকবর’কে। পরবর্তী মাসগুলোতে হাটহাজারীতে জোড়া খুন এবং চান্দগাঁওয়ে আফতাব হত্যাসহ তাঁর বিরুদ্ধে জমতে থাকে ১৫টিরও বেশি হত্যা ও অস্ত্রের মামলা।
পাহাড়তলীতে মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে ২২ জুলাই এজাহারভুক্ত আসামি মো. মিঠু ওরফে ‘ধামা ইলিয়াছ’কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
দুদিনের রিমান্ডে ধামা ইলিয়াছ উন্মোচন করেন নেটওয়ার্কের গোপন নকশা। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই গত ২৯ জুলাই রাতে ভারতের উদ্দেশ্যে দেশত্যাগের সময় যশোর সীমান্ত থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে ইমনকে।
ইমনের দেওয়া তথ্যে ৩০ জুলাই গভীর রাতে ফটিকছড়ির মানিকপুর গ্রামের পাইট্রাল টিলাপাড়ায় অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় অস্ত্রভান্ডার।
উন্মোচিত চট্টগ্রামের ত্রাস রাজত্বের বিষাক্ত মূল
ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার হয়েছেন, অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে-কিন্তু এতেই কি চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সংকট কেটে গেছে? এই ঘটনার গভীরে তাকালে দেখা যায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক কাঠামোগত ব্যর্থতার ভয়াবহ চিত্র, যা অবিলম্বে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অস্ত্রের মূল গোড়া কোথায়? ৫ আগস্টের পর থানা থেকে লুট হওয়া যে ১৫-২০টি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ইমনের হাতে শোভা পেত, তা উদ্ধার করতে এতদিন সময় লাগল কেন? সেই অস্ত্রগুলোর পেছনের মদদদাতা কারা?
জামিন ব্যবস্থার ফাঁকফোকর: একাধিক হত্যা মামলার আসামি এবং চিহ্নিত ক্যাডার হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মাত্র ২২ দিনে জামিন পেলেন ইমন? আদালত ও তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদনে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি রাখে।
অর্থায়ন ও ইন্ধনদাতার রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক: ইমন কেবল একজন ‘শুটার’ বা মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নকারী। বিদেশের মাটিতে বসে ‘বড় সাজ্জাদ’ যে বিশাল চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য চালাচ্ছেন, দেশে বসে সেই অর্থের বড় অংশ কারা ভোগ করছে?
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তবায়ন কেবল মাঠপর্যায়ের অস্ত্রধারী ক্যাডার গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।
পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের উচিত এখনই এই চক্রের নেপথ্যে থাকা গডফাদার, অর্থ জোগানদাতা এবং প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকদের মুখোশ উন্মোচন করা।
একটি সম্ভাবনাময় চায়নাম্যান স্পিনারের এই রক্তভেজা আন্ডারওয়ার্ল্ড যাত্রার ব্যবচ্ছেদ না হলে, চট্টগ্রামের বাতাসে আরও অসংখ্য ‘ডেভিড ইমন’ এর জন্ম হতে থাকবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

