back to top

মুজাফরাবাদ: রক্তে লেখা ৩ মে, স্মৃতিতে অমর এক গণহত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০২ মে, ২০২৬ ০৫:৩৪

রাজীব সেন প্রিন্স :
১৯৭১ সালের ৩ মে। দিনটি ছিল সোমবার। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মুজাফরাবাদ গ্রামে নেমে এসেছিল ইতিহাসের এক বিভীষিকাময় সকাল।

ভোরের আলো ফোটার আগেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, এদেশীয় দালালদের সহযোগিতায়, চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে পুরো গ্রাম। এরপর শুরু হয় নির্মমতা, যা আজও শিউরে ওঠার মতো।

অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নির্যাতন-কোনো বর্বরতাই বাদ রাখেনি পাকিস্তানি সেনারা। দিনভর চলে হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন আর ধ্বংসের উন্মত্ততা। আলবদর-রাজাকারদের প্রত্যক্ষ মদদে গ্রামের নারী-পুরুষদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরে সাড়ে তিনশ’রও বেশি বাঙালি হিন্দুকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়। শিশু, বৃদ্ধ, মা, মেয়ে-কেউ রেহাই পায়নি সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড থেকে।

এই গণহত্যায় নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত আড়াইশরও বেশি নাম শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় ছিল সেই দিনের ক্ষত। অসংখ্য নারী নির্যাতন, লাঞ্ছনা ও ধর্ষণের শিকার হন।

লোকলজ্জা, সামাজিক অবহেলা আর মানসিক যন্ত্রণায় অনেকেই গ্রাম ছেড়ে চলে যান। কেউ আশ্রয় নেন ভারতে, কেউ বেছে নেন আত্মহননের পথ।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে অন্তত তিনজন বীরাঙ্গনা নারীর কথা, যাঁদের মধ্যে দুজন পরবর্তীতে লোকচক্ষুর আড়ালে ভারতে চলে যান।

৩ মে’র সেই গণহত্যা শুধু শত শত প্রাণই কেড়ে নেয়নি; ধ্বংস করে দিয়েছিল একটি সমৃদ্ধ জনপদের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও সামাজিক কাঠামো।

পরবর্তীতে স্থানীয় রাজাকার ও আলবদরদের নিয়মিত আক্রমণে মুজাফরাবাদ গ্রাম প্রায় সম্পূর্ণরূপে জনশূন্য হয়ে পড়ে।

প্রাণ বাঁচাতে অনেকেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ত্রিপুরায় আশ্রয় নেন। আবার অনেকে অস্ত্র হাতে যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।

স্বাধীনতার পর যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীরা ফিরে আসেন নিজেদের ভিটেমাটিতে। স্বজন হারানোর গভীর বেদনা বুকে নিয়েও তারা নতুন করে গড়ে তোলেন মুজাফরাবাদ।

ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শুরু হয় নতুন স্বপ্নের পথচলা। আর সেই পথচলার অনুপ্রেরণা হয়ে আছে ১৯৭১ সালের ৩ মে’র আত্মত্যাগ।

দীর্ঘদিন স্থানীয়দের দাবির পর মুজাফরাবাদে নির্মিত হয়েছে শহীদদের স্মরণে কেন্দ্রীয় শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ। প্রতি বছর এখানে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, স্মরণসভা ও নানা আয়োজনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। তবুও গ্রামজুড়ে আজও যেন বিরাজ করে এক নিঃশব্দ শোক, এক অমলিন বেদনা।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী সংগঠন মুজাফরাবাদ সমন্বয় ও বধ্যভূমি সংরক্ষণ পরিষদ দীর্ঘদিন ধরে এই গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস পৌঁছে দিতে কাজ করে যাচ্ছে।

তাদের উদ্যোগে প্রতি বছরের মতো এবারও আগামীকাল রবিবার (৩রা মে) মুজাফরাবাদ কেন্দ্রীয় শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ প্রাঙ্গণে পটিয়া উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় পালিত হবে মুজাফরাবাদ গণহত্যা দিবস ২০২৬।

অনুষ্ঠানসূচিতে রয়েছে শহীদদের স্মরণে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান, উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার, স্মৃতি সৌধে পুষ্প শ্রদ্ধাঞ্জলি, স্মরণসভা এবং পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান।

এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পটিয়া আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আলহাজ এনামুল হক এনাম। সম্মানিত অতিথি থাকবেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারহানুর রহমান, পটিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব খোরশেদ আলম, ১৭ নং খরনা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মফজল আহমদ চৌধুরী, পটিয়া থানার ওসি জিয়াউল হকসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ, উপজেলা নেতৃবৃন্দ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

বধ্যভূমি সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি প্রফেসর ড. তাপসী ঘোষ রায়ের সভাপতিত্বে স্মরণসভায় স্বাগত বক্তব্য রাখবেন সমন্বয় সভাপতি ও বধ্যভূমি সংরক্ষণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব সেন এবং সমন্বয় সাধারণ সম্পাদক কাজল কর।

স্মরণসভার সঞ্চালনা করবেন সমন্বয়ের অর্থ সম্পাদক রাজীব সেন এবং শিক্ষক সুমন চক্রবর্তী।

৩রা মে গণহত্যা দিবস উদযাপন পরিষদ ২০২৬-এর আহ্বায়ক বাবু প্রদীপ কর, সদস্য সচিব বাবু দেবাশীষ দে এবং যুগ্ম আহ্বায়ক বাবু নিউটন বিশ্বাস সংগঠনের সদস্য, এলাকাবাসী ও সর্বস্তরের জনসাধারণকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

মুজাফরাবাদ শুধু একটি গ্রামের নাম নয়। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক রক্তাক্ত স্মারক।

৩ মে আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে কত অগণিত প্রাণ, কত অশ্রু আর কত ত্যাগ জড়িয়ে আছে। শহীদদের এই আত্মদান আমাদের চিরকাল প্রেরণা জোগাবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শক্তি দেবে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি