এপ্রিল মাসে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল পরিসংখ্যান নয়—বরং এক গভীর নিরাপত্তাহীনতার প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, এক মাসেই দেশে মোট ৫৮৬টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৬৩ জন, আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৭৯ জন।
এই বিপুল হতাহতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপ ছিল সড়কপথে। শুধু সড়কেই ৫২৭টি দুর্ঘটনায় ৫১০ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৬৮ জন আহত হন।
অর্থাৎ, মোট দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির বড় অংশই ঘটেছে দেশের প্রধান যোগাযোগমাধ্যম সড়কপথে, যা দেশের সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থার ঝুঁকিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
রেলপথেও পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। এপ্রিলে ৫৪টি রেল দুর্ঘটনায় ৪৯ জন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে নৌপথে ৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪ জন। সংখ্যায় তুলনামূলক কম হলেও, প্রতিটি প্রাণহানিই নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার দিকটি নির্দেশ করে।
ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল চট্টগ্রাম বিভাগ। এপ্রিলে এ বিভাগে ১৩৫টি দুর্ঘটনায় ১৩৭ জন নিহত এবং ২৬৩ জন আহত হন।
দেশের বাণিজ্যিক ও গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে এত বিপুল দুর্ঘটনা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
বিপরীতে ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল সবচেয়ে কম—১৭টি, তবে সেখানে ১৮ জন নিহত এবং ৬৪ জন আহত হন, যা প্রমাণ করে কম সংখ্যক দুর্ঘটনাও ভয়াবহ হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতরা সমাজের প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। চালক, পথচারী, শিক্ষার্থী, পরিবহন শ্রমিক থেকে শুরু করে নারী, শিশু, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মীরাও এই তালিকায় রয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে ৯৯ জন চালক, ৮২ জন পথচারী, ৫৬ জন শিক্ষার্থী, ৫২ জন নারী এবং ৪৭ জন শিশু—যা পরিস্থিতির বহুমাত্রিক ভয়াবহতা তুলে ধরে।
দুর্ঘটনার স্থান বিশ্লেষণও উদ্বেগ বাড়ায়। ৩৮.৫১ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে, ৩১.৪৯ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ২২.৯৬ শতাংশ ফিডার রোডে।
এছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরী এবং রেলক্রসিং এলাকাও দুর্ঘটনার ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকদের মতে, দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও ব্যবস্থাপনাগত কারণ কাজ করছে।
এর মধ্যে রয়েছে অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ট্রাফিক আইন অমান্য, উল্টোপথে চলাচল, সড়কের দুর্বল অবকাঠামো, পর্যাপ্ত রোড সাইন ও আলোকসজ্জার অভাব এবং অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সংগঠনটি প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা, দক্ষ চালক তৈরি, সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন, ফিটনেস নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক শৃঙ্খলা জোরদার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
একই সঙ্গে সড়ক পরিবহন খাতে ব্যাপক সংস্কার, স্মার্ট টোল ও ভাড়া ব্যবস্থা চালু এবং বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধির সুপারিশও করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে এপ্রিল মাসের এই পরিসংখ্যানে যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সংকটকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।
বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের উচ্চ দুর্ঘটনার হার ইঙ্গিত দিচ্ছে, ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলভিত্তিক আলাদা নীতি ও কঠোর বাস্তবায়ন ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



