চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত কনটেইনার টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আবারও দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিল।
সদ্য সমাপ্ত মে মাসে টার্মিনালটিতে ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একক) কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা এনসিটির ইতিহাসে একক মাসে সর্বোচ্চ। এর মাধ্যমে মাত্র সাত মাস আগে গড়া আগের রেকর্ডও ভেঙে গেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে এনসিটিতে এক মাসে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৩৩ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল।
সর্বশেষ মে মাসে সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে টার্মিনালটি।
মে মাসে হ্যান্ডলিং হওয়া মোট কনটেইনারের মধ্যে আমদানি পণ্য ছিল ৫৯ হাজার ৮৫১ টিইইউস এবং রপ্তানি পণ্য ছিল ৬৬ হাজার ৬৪৫ টিইইউস।
সব মিলিয়ে ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে।
অর্থাৎ পুরো মাসে দৈনিক গড়ে ৪ হাজার ৮১ টিইইউস কনটেইনার ওঠানামা হয়েছে, যা বন্দরের কার্যক্রমের গতি ও সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, বন্দরের পরিচালনা বোর্ডের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল) বর্তমানে এনসিটি পরিচালনা করছে।
২০২৫ সালের ৭ জুলাই অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিষ্ঠানটি টার্মিনালের বিভিন্ন কার্যক্রমে গতি আনার উদ্যোগ নেয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের চিফ পারসোনেল অফিসার মো. নাসির উদ্দিন বলেন, জাহাজ পয়েন্ট, ডেলিভারি পয়েন্ট, অ্যাপ্রাইজ পয়েন্ট, সিএন্ডএফ শেড এবং বিভিন্ন প্রবেশ ও বহির্গমন গেটে দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের তৎপরতার ফলে কনটেইনার খালাস ও লোডিং কার্যক্রম আরও দ্রুত এবং কার্যকর হয়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক হ্যান্ডলিং সক্ষমতায়।
বন্দরসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় কনটেইনার টার্মিনাল হলো এনসিটি।
প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই টার্মিনালে একই সময়ে ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচটি জাহাজ ভেড়ানো যায়।
চারটি জেটি নিয়ে গড়ে ওঠা এই টার্মিনালের মাধ্যমে বন্দরের মোট কনটেইনারের প্রায় অর্ধেক হ্যান্ডলিং সম্পন্ন হয়।
এনসিটির অন্যতম শক্তি এর অবকাঠামোগত সক্ষমতা। টার্মিনালে ব্যাকআপ সুবিধা হিসেবে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ইয়ার্ড। জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানামার জন্য রয়েছে বন্দরের মালিকানাধীন ১৪টি গ্যান্ট্রি ক্রেন।
পাশাপাশি কনটেইনার স্থানান্তর ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের যন্ত্রপাতিও রয়েছে এখানে। টার্মিনালটির অবকাঠামো ও সরঞ্জামে বিনিয়োগ করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এনসিটির পরিচালনা নিয়ে গত কয়েক বছরে নানা আলোচনা ও বিতর্ক ছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কোনো ধরনের বিনিয়োগ ছাড়াই সাইফ পাওয়ার টেক টার্মিনাল পরিচালনার মাধ্যমে বিপুল আর্থিক সুবিধা পেয়েছে বলে সমালোচনা ছিল।
একই সময়ে দেশি কিংবা বিদেশি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে টার্মিনাল পরিচালনায় তেমন সুযোগ দেওয়া হয়নি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এনসিটি পরিচালনা থেকে সাইফ পাওয়ার টেককে সরিয়ে দিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে না দেওয়ার দাবিতে বিভিন্ন পক্ষ আন্দোলনে নামে। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের ৭ জুলাই থেকে নৌবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেডকে এনসিটির দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সর্বশেষ রেকর্ড গড়া হ্যান্ডলিং পরিসংখ্যানকে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম যত গতিশীল হবে, ততই শিল্প উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বন্দরসংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



