সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যাতায়াতের প্রতীক হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)।
কিন্তু গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অবাধ লুটপাটের ময়দানে পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের হওয়া অভিযোগ এবং বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ নথিপত্র সেই হরিলুটের ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করেছে।
জুলাই ২০২২ থেকে জুন ২০২৫-মাত্র তিন বছরে শুধু এই একটি ডিপোতেই ১৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকারও বেশি অপচয়, ক্ষতি ও চুরির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে।
ভুয়া বিল, জ্বালানি ও ফেরি খরচ ফাঁকি, অগ্রিম ভাতা, টিএ/ডিএ আত্মসাৎ এবং হিসাব জালিয়াতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ গিলে খেয়েছে একটি চক্র।
দুদকে দায়ের করা অভিযোগে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর রাজস্ব আদায়, জ্বালানি ও নির্ধারিত ব্যয় নির্বাহের নামে অতিরিক্ত অর্থ তুলে নেওয়ার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। বিআরটিসির কেন্দ্রীয় স্টোর অফিসার মো. মোস্তাকিজুর রহমানের দায়ের করা অভিযোগে ৪৩০ পাতারও বেশি তথ্য-প্রমাণ সংযুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগে উঠে এসেছে তৎকালীন ইউনিট প্রধান (ম্যানেজার অপারেশন) মো. মফিজ উদ্দিনের নাম। তিনি জুলাই ২০২২ থেকে আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে ক্যাশিয়ার ও হিসাব কর্মকর্তার যোগসাজশে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার অপচয় ও চুরির সরাসরি নেপথ্যে ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মফিজ উদ্দিনের স্থলাভিষিক্ত হয়ে সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত একই অনিয়মের ধারা বজায় রাখার অভিযোগ উঠেছে ডিপোর সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর মো. কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে।
অভিযোগে ক্যাশিয়ার মো. আ. করিম এবং হিসাব কর্মকর্তা মো. রমজান হোসেনকেও ক্ষমতার অপব্যবহারের দোসর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিআরটিসির অভ্যন্তরে দীর্ঘ দিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ভাঙিয়ে অপরাধ ঢাকার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজেকে চট্টগ্রামের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয়ে গুরুত্বপূর্ণ সব ডিপোর নিয়ন্ত্রণ হাতে নেন মো. মফিজ উদ্দিন। চট্টগ্রাম ছাড়াও কুমিল্লা ও বরিশালের মতো লাভজনক ডিপোতে তিনি দাপটের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
একই কৌশলে আরেক অভিযুক্ত মো. কামরুজ্জামান কুমিল্লার পারিবারিক সূত্র ব্যবহার করে সাবেক এক প্রভাবশালী এমপির আত্মীয় পরিচয়ে একের পর এক সুবিধাজনক পদে বহাল থাকেন।
ক্ষমতার পালাবদলের পরও তাদের প্রভাব কমেনি; সম্প্রতি কামরুজ্জামানকে খুলনা বাস ডিপোর মতো সংবেদনশীল ইউনিটে পদায়ন করা নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে এমন অনিয়মের উপস্থিতি স্বীকার করে গণমাধ্যমকে বলেন, বিআরটিসিতে ফ্যাসিস্ট সরকারের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। তারা নানান অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। শিগগির তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থান-কাল-পাত্র বদলে গেলেও দুর্নীতিবাজ এই সিন্ডিকেটের টিকে থাকা প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, মেধা ও যোগ্যতার তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক প্রভাব ও লেনদেনের মাধ্যমে পদে বসানো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির চরম রূপ।
এ ধরনের সিন্ডিকেট শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলাই ধ্বংস করে না, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে জনগণের বিশ্বাসও তুলে দেয়। সূত্র-ডিএএম
সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে যখন হিসাব জালিয়াতি চলে, তখন তা আর ব্যক্তিগত অপকর্ম থাকে না, তা প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে রূপ নেয়। ক্ষমতার পালাবদলের পর সংস্কারের যে তাগিদ তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য।
উল্লেখ্য, উত্থাপিত চাঞ্চল্যকর অনিয়ম ও অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত মো. মফিজ উদ্দিন ও মো. কামরুজ্জামানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


