পটিয়ায় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নাকি ক্ষমতার মারপ্যাঁচ?

হাসপাতালের গেটে দফায় দফায় সংঘর্ষ: ১৩ নেতাকর্মী রক্তাক্ত!

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:১৯

চট্টগ্রামের পটিয়ায় রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা নাকি এলাকার একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই? এ নিয়ে দলীয় কোন্দলের জেরে মুখোমুখি রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছে যুবদলের দুই পক্ষ।

চুরির সালিশ কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সামান্য বিরোধ শেষ পর্যন্ত গড়ায় হাসপাতালেও। আহত নেতার চিকিৎসার পথ রোধ করে হাসপাতালের প্রবেশমুখেই হাতাহাতি ও মারধরে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকা।

তিন দফায় ঘটা এই সহিংসতায় যুবদল ও ছাত্রদলের অন্তত ১৩ জন নেতাকর্মী রক্তাক্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা সংকটজনক।

জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত হয় তিন দিন আগের একটি সাধারণ চুরিকে কেন্দ্র করে। জঙ্গলখাইন ইউনিয়নের বাদামতল এলাকায় নুরুল ইসলাম চেয়ারম্যানের বাড়িতে চুরির ঘটনায় স্থানীয় ইরফান নামের এক কিশোরকে সন্দেহ করা হচ্ছিল।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য ও দক্ষিণ জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সুজন ওই কিশোরকে ডেকে সতর্ক করেন যেন সে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে না জড়ায়।

তবে এই উদ্যোগ সহজভাবে নেননি যুবদল নেতা মো. আমজাদ। এ নিয়ে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে সুজনের সঙ্গীরা আমজাদকে টেনেহিঁচড়ে মাটিতে ফেলে দেন বলে অভিযোগ ওঠে। সামান্য এই সালিশি বিরোধই রাতারাতি পরিণত হয় রাজনৈতিক বিষবাষ্পে।

রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৯টা: তিন দফার রক্তক্ষয়ী তাণ্ডব

প্রথম ঘটনার পর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়াতে থাকে। প্রথম আঘাত রাত ৮ টা, ক্ষুব্ধ আমজাদের সমর্থকরা সংঘবদ্ধ হয়ে সুজনসহ ৪-৫ জনের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। বেধড়ক মারধরে গুরুতর আহত হন সুজন।

হাসপাতালে দ্বিতীয় দফায় তাণ্ডব রাত ৯ টা, সুজনকে উদ্ধার করে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানেও রেহাই মেলেনি। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানোর সময় হাসপাতালের প্রবেশমুখে দুই পক্ষ ফের মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ সময় একে অপরের ওপর হামলায় রণক্ষেত্রে রূপ নেয় হাসপাতাল চত্বর।

তিন দফার এই সহিংসতায় ইউপি সদস্য মো. সুজন, যুবদল নেতা মো. আমজাদ এবং ছাত্রদলকর্মী জাহাঙ্গীর, টিপু, আজাদ, ইরফান, শুভ, বোরহান, রায়হান, মাশফি, আফজল, রাফি ও আরফান গুরুতর আহত হন।

আহতদের মধ্যে সাবেক ইউপি সদস্য ও দক্ষিণ জেলা যুবদল নেতা মো. সুজনের অবস্থা গুরুতর। বর্তমানে চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এছাড়া যুবদল নেতা মো. আমজাদ পটিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং ছাত্রদলকর্মী জাহাঙ্গীর, টিপু, আজাদ, ইরফান, শুভ, বোরহান, রায়হান, মাশফি, আফজল, রাফি, আরফান পটিয়া হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, এটি দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ ও আধিপত্যের প্রকাশ। আমজাদ হলেন জঙ্গলখাইন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সেলিম উদ্দীনের বলয়ের অনুসারী।

অন্যদিকে সুজন হলেন হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সদস্য শফিকুল ইসলামের অনুসারী।

সম্প্রতি হুলাইন পাইরোল উচ্চবিদ্যালয়ের একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও এই দুই পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছিল। সেই থেকে এলাকা দখলের প্রতিযোগিতায় দুই পক্ষের সম্পর্কের পারদ দিন দিন উত্তপ্ত হচ্ছিল।

সংঘর্ষের বীভৎসতা বর্ণনা করতে গিয়ে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মো. হাদী জানান, আহত সুজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চমেক হাসপাতালে রেফার করার পর অ্যাম্বুলেন্সে তোলার মুহূর্তেই হাসপাতালের গেটে ব্যাপক হট্টগোল ও মারামারি শুরু হয়। সাধারণ রোগী ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি দ্রুত পটিয়া থানায় খবর দেন।

এদিকে জঙ্গলখাইন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সেলিম উদ্দীন বলেন, প্রথমে হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের লোকজন এসে আমাদের জঙ্গলখাইন ইউনিয়নের লোকজনকে মারধর করে। এর জের ধরেই পরবর্তী সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে।

পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক বলেন, সংঘর্ষের সংবাদ পেয়ে তাৎক্ষণিক পুলিশ পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।

এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ আমরা পেয়েছি। ঘটনার পেছনের মূল কারণ ও জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি