বদলির আগের দিন সাবরেজিস্ট্রারের ‘ম্যাজিক’: একদিনেই সন্ত্রাসীর ৬৫ দলিল রেজিস্ট্রি!

শতকোটির জমি জালিয়াতির নেপথ্যে দুই কোটির ঘুষ বাণিজ্য?

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩:৫৬

বদলির আদেশ হয়েছে। নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার অপেক্ষা। এর মধ্যেই এক দিনে নিবন্ধন করা হলো ৬৫টি জমির বিক্রয় দলিল।

প্রশাসনিক বদলির আদেশ যেন এক সুপ্ত জাদুর কাঠি-যার ছোঁয়ায় মুহূর্তেই বদলে যায় সব নিয়মকানুন।

বদলির আদেশ পাওয়ার ঠিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আইন ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এক দিনে সন্ত্রাসীর নামে থাকা ৬৫টি জমির বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড সাবরেজিস্ট্রি অফিসে।

জমিগুলোর মালিকানা ছিল জঙ্গল সলিমপুরের আলোচিত সন্ত্রাসী ইয়াসিনের নামে। পুলিশ এবং গোয়েন্দা খাতার ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকাভুক্ত এ অপরাধীর বিশাল সম্পত্তি রাতারাতি বৈধ করার এই প্রক্রিয়ার পেছনে ঘুষ লেনদেনের গুঞ্জন ওঠেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, বিপুলসংখ্যক দলিল এক দিনে নিবন্ধনের ঘটনায় সীতাকুণ্ডের সাবরেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবের বিরুদ্ধে দুই কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

তাছাড়া শতকোটি টাকার এই সম্পদ জালিয়াতির ঘটনায় প্রশাসনের উচ্চ মহলে শুরু হয়েছে তোলপাড়।

একদিকে র‌্যাব কর্মকর্তা হত্যা মামলার আসামি ও পুলিশের খাতায় মোস্ট ওয়ান্টেড হিসেবে পরিচিত ইয়াসিন, অন্যদিকে তার নামে থাকা বিপুল পরিমাণ জমির দ্রুত হাতবদল। মাঝখানে সরকারি নিবন্ধন কার্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় অঙ্কের সম্পদ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই হয়েছিল কি না, নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না এবং এর পেছনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ কতটা।

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর আইন মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।

গত বুধবার বিকেলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়ে মৌখিক অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হাবীবের বদলির আদেশ সাত দিনের জন্য স্থগিত করেছে মন্ত্রণালয়।

এদিকে, বিষয়টি নিয়ে হাবীবকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফখরুল ইসলাম।

বদলির পরদিনই তড়িঘড়ি তৎপরতা ও ‘ম্যাজিক’ ৬৫ দলিল:

সীতাকুণ্ড সাবরেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার সাবরেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবকে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে বদলি করা হয়। বৃহস্পতিবারের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল তাঁর।

কিন্তু নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার আগের দিন বুধবার ইয়াসিনের নামে থাকা ৬৫টি জমির বিক্রয় দলিল নিবন্ধন করেন তিনি। এত বিপুলসংখ্যক দলিল এক দিনে নিবন্ধনের বিষয়টি সামনে আসার পরই শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।

প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী বদলির আদেশ পাওয়ার পর নতুন কর্মস্থলে যোগদানের পূর্বমুহূর্তে নতুন কোনো বড় বা জটিল লেনদেন বা দলিল নিবন্ধনের সুযোগ বা নৈতিকতা থাকে না।

অথচ, সেই নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রায়হান হাবীব বুধবারে সম্পন্ন করেন জঙ্গল সলিমপুরের কুখ্যাত ‘ইয়াসিন বাহিনী’র প্রধান মো. ইয়াসিনের নামে থাকা ৬৫টি বিক্রয় দলিল।

অফিস সূত্রের দাবি, এই বিশেষ ‘ম্যাজিক’ দলিলের নেপথ্যে কাজ করেছে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন-যা আনুমানিক দুই কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।

ইয়াসিনের নামে কীভাবে জমল এত সম্পদ?

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গল সলিমপুরে ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।

আলীনগর দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ইয়াসিন ও তার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেখানে পুলিশের অভিযানের পর ইয়াসিন ও তার সহযোগীরা পালিয়ে যান।

তবে মো. ইয়াসিনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি খাসজমি দখল ও নানা কৌশলে জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠার অভিযোগ রয়েছে।

সীতাকুণ্ড সাবরেজিস্ট্রি অফিস সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গল সলিমপুরের বিপুল পরিমাণ সরকারি খাসজমি বিভিন্ন কৌশলে নিজের নামে বিএস (বাংলাদেশ সার্ভে) রেকর্ড করিয়ে নিয়েছিলেন ইয়াসিন। গত তিন মাস ধরে এসব জমি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রির চেষ্টা চলছিল।

প্রচলিত ভূমি আইন অনুযায়ী, কোনো দলিল রেজিস্ট্রি করতে হলে জমির মূল দাতা বা বিক্রেতাকে অবশ্যই সাবরেজিস্ট্রি অফিসে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হয়।

প্রশ্ন উঠেছে-পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পলাতক থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন কি নিজে উপস্থিত হয়ে এই দলিলগুলো সম্পন্ন করেছেন, নাকি তার অনুপস্থিতিতে কোনো জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে?

সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ইয়াসিনের নামে থাকা ৬৫টি জমির বিক্রয় দলিলের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন।

পরে এসব জমি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে বিক্রির দলিল ইস্যু করেন সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব।
এসব বিষয়ে কথা বলতে বৃহস্পতিবার সকালে সীতাকুণ্ড সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ে রায়হান হাবীবের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও তার সাক্ষাৎ মেলেনি। পরে ফোনে যোগাযোগ করেও কোন সংযোগ পাওয়া যায়নি।
যদিও সাবরেজিস্ট্রার অফিসের সহকারী সিরাজউদ্দিন গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন, কাগজপত্রে নামজারি ও খাজনা আপডেট থাকায় এবং সরকারের বিশেষ কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় নিয়ম মেনেই দলিলগুলো রেজিস্ট্রি করা হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, শতকোটি টাকার বাজারমূল্যের জমি এবং একজন পলাতক আসামির সম্পত্তি বদলি আদেশের ঠিক আগের দিন রহস্যজনক দ্রুততায় রেজিস্ট্রি করার ঘটনা কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না।
বর্তমানে রেজিস্ট্রি হওয়া দলিলপত্রগুলোর কপি আইন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসক এবং চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হস্তান্তরিত সম্পত্তির প্রকৃত পরিমাণ, গ্রহীতাদের পরিচয়, এর সাথে সরকারের কোনো স্বার্থ জড়িত আছে কি না এবং দাতার উপস্থিতির সত্যতা-সবকিছুই তদন্ত কমিটির নজরে রয়েছে।

একই বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানিয়েছেন, বিষয়টি জানার পরপরই ঘটনাটি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

এর আগে তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, সীতাকুণ্ডের ইউএনও হাবীবকে ডেকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইয়াসিন নিজে তার কাছে আসেননি। বিধিমালা ও আইন অনুযায়ী, তার কাছে কাগজপত্র নিয়ে আসায় দলিলগুলো রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি দীর্ঘকাল ধরে অপরাধের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। এই এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত ইয়াসিন ও রুকন মেম্বার বাহিনী।

গত ১৯ জানুয়ারি সীতাকুণ্ডে আসামিদের ধরতে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলার মুখে পড়ে র‌্যাবের একটি দল। সে সময় পৈশাচিক হামলায় প্রাণ হারান র‌্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া।

সর্বশেষ গত ২৪ মে গভীর রাতে দুই থেকে তিন শ সন্ত্রাসী রাস্তা কেটে নির্মাণাধীন র‌্যাব ও যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ সময় র‌্যাবের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের রাতভর গুলিবিনিময় হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০৪ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়।

এ ঘটনায় ইয়াসিনকে প্রধান আসামি করে তিন শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে সীতাকুণ্ড থানা-পুলিশ। তবে এখনো পর্যন্ত ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এমন নজির ভবিষ্যতে ভূমি প্রশাসনের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কতটা তলানিতে নিয়ে ঠেকায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই ঘুষ বাণিজ্য ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি