মায়ের হাতের তৈরি নাস্তা-তাতে থাকে একবুক ভালোবাসা আর পরম মমতা। কিন্তু সেই মায়ের ভালোবাসাই যে এক নববধূর জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা কে জানত!
সামান্য এক প্লেট নাস্তার পরিমাণ কম হওয়াকে কেন্দ্র করে জন্ম নেওয়া তুচ্ছ বচসা শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল ২২ বছরের এক তরতাজা প্রাণ।
সেই সঙ্গে চিরতরে নিভে গেল এক অনাগত শিশুর পৃথিবীতে আসার সম্ভাবনাও।
চট্টগ্রামের পটিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) টানা ৯ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছিলেন সিফাতুন নুর।
অবশেষে গত শুক্রবার দুপুরে আইসিইউর ঠান্ডা কেবিনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিন মাসের এই অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ।
সিফাতুনের এই করুণ প্রস্থান আমাদের সমাজের ভেঙে পড়া পারিবারিক মূল্যবোধ এবং চরম অসহিষ্ণুতার এক করুণ চিত্রচিত্রণ।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাত্র পাঁচ মাস আগে চন্দনাইশ পৌরসভার বাসিন্দা মো. নুরের মেয়ে সিফাতুন নুরের বিয়ে হয় পটিয়া উপজেলার কুসুমপুরা ইউনিয়নের পূর্ব কুসুমপুরা গ্রামের দুবাইপ্রবাসী মো. তারেকের (২৬) সঙ্গে।
বিয়ের পর স্বামী প্রবাসে থাকায় সিফাতুন শ্বশুরবাড়িতেই থাকতেন। তবে পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই যৌতুক কিংবা নানা অজুহাতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে হতো সিফাতুনকে।
গত ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় সিফাতুনের মা জুহিনুর আক্তার (৫৫) মেয়ের জন্য নিজ হাতে তৈরি কিছু নাস্তা নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে যান।
একজন মায়ের এই ভালোবাসা গ্রহণ করার বদলে শ্বশুরবাড়ির লোকজন শুরু করেন তীব্র বাকবিতণ্ডা-অভিযোগ একটাই, ‘নাস্তার পরিমাণ কেন কম হলো?‘
তুচ্ছ এই বিষয়টি মুহূর্তেই রূপ নেয় অমানবিক হিংস্রতায়।
অভিযোগ উঠেছে, সিফাতুনের শাশুড়ি রিজিয়া বেগম (৬০) মেয়ের সামনেই তার প্রবীণ মাকে মারধর করতে শুরু করেন। মা-কে বাঁচাতে আকুল হয়ে এগিয়ে এসেছিলেন সন্তানসম্ভবা সিফাতুন। কিন্তু রেহাই মেলেনি তারও।
একই সময় রাশেদা বেগম (৫৫) ও সুমি আক্তার (৫২) সিফাতুনের চুলে ধরে টেনে মাটিতে ফেলে উপর্যুপরি আঘাত করেন। মা ও মেয়ের আর্তচিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে তাদের উদ্ধার করেন।
সেই কালো রাতের পর সিফাতুনের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ভর্তি করা হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপর সংজ্ঞাহীন অবস্থায় কেটে যায় দীর্ঘ ৯টি দিন।
আইসিইউর চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা আর স্বজনদের অশ্রুসজল প্রার্থনাকে ব্যর্থ করে দিয়ে শুক্রবার দুপুর দেড়টায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমান সিফাতুন।
যে গৃহবধূর কোলে কিছুদিন পর নতুন অতিথি আসার আনন্দ থাকার কথা ছিল, সেই ঘর এখন নিথর, স্তব্ধ।
সিফাতুনের বাবা মো. নুর ক্ষোভ ও সুতীব্র বেদনায় জানান, ঘটনার পর অপরাধ ঢাকতে সিফাতুন নাকি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন, এমন অপপ্রচারও চালানো হয়েছিল। তিনি এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িতদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন।
ঘটনার দিন ১৪ অক্টোবরই পটিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন সিফাতুনের মা জুহিনুর আক্তার।
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হক জানান, নির্যাতনের লিখিত অভিযোগের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় গৃহবধূর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


