হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডে মাত্র ১৫ দিন আগে এই পৃথিবীর আলো দেখা ফুটফুটে কন্যাসন্তান নাজেহাদকে বুকে চেপে ঘুমিয়েছিলেন মা।
মাঝরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন মায়ের চোখ খুলল, তখন বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে। পাশে নেই নাড়িছেঁড়া ধন! শূন্য বিছানা আর চাদরটা পড়ে আছে অবহেলায়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে মুহূর্তেই নেমে আসে নিখোঁজ শিশুর মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ।
তবে সেই মাতৃত্বের হাহাকার চব্বিশ ঘণ্টাও স্থায়ী হতে দেয়নি পুলিশ। মাঝরাতে কোল খালি হওয়া সেই অবুজ শিশুকে ভোরের আলো ফোটার আগেই মায়ের বুকে ফিরিয়ে দিয়েছে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ।
এক রুদ্ধশ্বাস ও নিখুঁত অভিযানে চান্দগাঁও এলাকা থেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে শিশু নাজেহাদকে।
একই সাথে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়েছে নিজেদের ‘বাবা-মা’ দাবি করা এক অপহরণকারী দম্পতিকে।
পুলিশ জানায়, চমেক হাসপাতাল থেকে শিশু চুরির ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পরপরই হাসপাতালজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। রাতেই পাঁচলাইশ থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করে শিশুটির পরিবার।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে মাঠে নামে পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ জানতে পারে, চোর চক্রটি নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন ‘এক কিলোমিটার’ এলাকায় অবস্থান করছে।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার ভোররাতে ওই এলাকায় ঘেরাও করে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে একটি নির্দিষ্ট বাড়িতে অভিযান চালানো হয়।
ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, বিছানায় শুয়ে কাঁদছে ১৫ দিনের নাজেহাদ। আর তাকে আগলে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন এক নারী ও পুরুষ।
ঘটনাস্থল থেকেই অপহৃত শিশু নাজেহাদকে উদ্ধার করে পুলিশ। একই সাথে শিশু অপহরণ ও নিজেদের হেফাজতে রাখার অপরাধে নোয়াখালীর হাতিয়া এলাকার আলা উদ্দিনের মেয়ে নাছিমা বেগম (২৫) এবং তার স্বামী বাঁশখালী উপজেলার মফিজুর রহমানের ছেলে বোরহান উদ্দীন (৩০) কে গ্রেফতার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পেরেছে, গ্রেফতারকৃত নাছিমা ও বোরহান দম্পতি মূলত নিজেদের একটি সন্তান পাওয়ার ব্যাকুলতা কিংবা ভিন্ন কোনো অপরাধ চক্রের সাথে জড়িত থাকার উদ্দেশ্যে এই চুরির ছক কষেছিলেন।
চমেক হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডে ছদ্মবেশে ঘোরাফেরা করছিলেন নাছিমা। মাঝরাতে যখন নাজেহাদের মা ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েন, ঠিক তখনই সুকৌশলে শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেন তিনি।
বাইরে অপেক্ষায় থাকা স্বামী বোরহানসহ দ্রুত তারা চান্দগাঁওয়ের আস্তানায় গিয়ে ওঠেন এবং নিজেদের সন্তান বলে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করেন।
তবে পুলিশের ক্ষিপ্র গতির কারণে সেই ‘নকল’ বাবা-মায়ের সংসার গড়ার চক্রান্ত ভেস্তে যায়।
সকালে পাঁচলাইশ থানায় যখন উদ্ধার হওয়া নাজেহাদকে তার আসল মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তখন থানার পরিবেশ হয়ে ওঠে আবেগঘন।
সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদছিলেন মা। তবে এ কান্না হারানোর নয়, এ কান্না ফিরে পাওয়ার।
অশ্রুসিক্ত চোখে শিশুটির বাবা বলেন, “মাঝরাতে যখন বাচ্চাকে পাচ্ছিলাম না, মনে হয়েছিল দুনিয়াটাই অন্ধকার হয়ে গেছে। আমরা তো গরিব মানুষ, ভেবেছিলাম আর কখনো কলিজার টুকরাকে দেখতে পাব না। পুলিশ আমাদের যে উপকার করল, তা সারাজীবন মনে থাকবে।”
পাঁচলাইশ থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃত ‘নকল’ বাবা-মা অর্থাৎ নাছিমা ও বোরহানকে ইতিমধ্যে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
চমেক হাসপাতালের মতো একটি সংবেদনশীল সরকারি কেপিআই (KPI)ভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে মাঝরাতে কীভাবে একটি শিশু চুরি হয়ে গেল, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের মতে, পুলিশের এই ত্বরিত অভিযান প্রশংসার দাবিদার হলেও হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা এবং বহিরাগতদের প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এখন সময়ের দাবি।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


